
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে নিহত ছয় মার্কিন সেনাসদস্যের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার আনুষ্ঠানিকতা বা ‘ডিগনিফাইড ট্রান্সফার’-এ শনিবার ডেলাওয়ারের ডোভার এয়ার ফোর্স বেসে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। নিহত সেনাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এই শোকাবহ অনুষ্ঠানে অংশ নেন তারা। যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনাদের মরদেহ দেশে ফেরানোর এই আনুষ্ঠানিকতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অন্যতম গুরুগম্ভীর দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়।
মিয়ামিতে লাতিন আমেরিকার নেতাদের এক সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার পর ট্রাম্প ডেলাওয়ারে যান। সেখানে তিনি বলেন, নিহত সেনারা বীরের মতো দেশ রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন এবং তারা এমনভাবে দেশে ফিরছেন, যা তারা কখনও কল্পনা করেননি। তিনি একে “অত্যন্ত দুঃখজনক পরিস্থিতি” বলে উল্লেখ করে ভবিষ্যতে মার্কিন সেনাদের যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুর ঘটনা যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন।
ডোভার এয়ার ফোর্স বেসে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে ট্রাম্প ও ভ্যান্সের পাশাপাশি তাদের স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। আরও উপস্থিত ছিলেন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা, যার মধ্যে ছিলেন যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী পিট হেগসেথ, অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাম বন্ডি, হোয়াইট হাউস চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড। আইওয়া, মিনেসোটা, নেব্রাস্কা এবং ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের কয়েকজন গভর্নর ও সিনেটরও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
নিহত সেনারা হলেন মেজর জেফ্রি ও’ব্রায়েন (৪৫), আইওয়ার ইন্ডিয়ানোলা শহরের বাসিন্দা; ক্যাপ্টেন কোডি খর্ক (৩৫), ফ্লোরিডার উইন্টার হেভেনের বাসিন্দা; চিফ ওয়ারেন্ট অফিসার ৩ রবার্ট মারজান (৫৪), ক্যালিফোর্নিয়ার স্যাক্রামেন্টোর বাসিন্দা; সার্জেন্ট ফার্স্ট ক্লাস নিকোল আমোর (৩৯), মিনেসোটার হোয়াইট বেয়ার লেকের বাসিন্দা; সার্জেন্ট ফার্স্ট ক্লাস নোয়া টিটজেন্স (৪২), নেব্রাস্কার বেলভিউ শহরের বাসিন্দা; এবং সার্জেন্ট ডেকলান কোডি (২০), আইওয়ার ওয়েস্ট ডেস মইনসের বাসিন্দা, যিনি মৃত্যুর পর স্পেশালিস্ট পদ থেকে পদোন্নতি পান।
সামরিক নিয়ম অনুযায়ী মরদেহ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট কোনো বক্তব্য দেননি। নীল স্যুট, লাল টাই এবং সাদা ‘ইউএসএ’ লেখা টুপি পরা ট্রাম্প প্রতিটি আমেরিকান পতাকায় মোড়ানো কফিন বিমান থেকে নামানোর সময় স্যালুট জানান। প্রায় আধা ঘণ্টা স্থায়ী এই অনুষ্ঠানে নিহত সেনাদের পরিবার সদস্যরা নীরবে পুরো প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেন।
এই ছয়জন সেনাসদস্য ছিলেন মার্কিন আর্মি রিজার্ভের সদস্য এবং আইওয়ার ডেস মইনস-ভিত্তিক ১০৩তম সাসটেইনমেন্ট কমান্ডের অন্তর্ভুক্ত। এই ইউনিট মূলত খাদ্য, জ্বালানি, পানি, গোলাবারুদ, পরিবহন সরঞ্জাম এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনার কাজ করে। কুয়েতে একটি কমান্ড সেন্টারে ড্রোন হামলায় তারা নিহত হন। এই হামলার ঘটনা ঘটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার একদিন পর।
আইওয়ার রিপাবলিকান সিনেটর জোনি আর্নস্ট, যিনি নিজেও একজন যুদ্ধ অভিজ্ঞ সেনা, নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, এই সৈন্যরা তাদের সহযোদ্ধাদের রক্ষা এবং দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো মহান দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন। তাদের প্রতি জাতির ঋণ কখনো শোধ করা সম্ভব নয়।
নিহত সার্জেন্ট ফার্স্ট ক্লাস নিকোল আমোরের স্বামী জোয়ি আমোর জানান, কয়েক দিনের মধ্যেই তার স্ত্রীর বাড়ি ফেরার কথা ছিল। তিনি বলেন, কুয়েতে গিয়ে এমন কিছু ঘটবে তা তারা কখনও ভাবেননি, আর তার স্ত্রীর এভাবে নিহত হওয়া তাদের পরিবারের জন্য গভীর বেদনাদায়ক।
মেজর জেফ্রি ও’ব্রায়েন প্রায় ১৫ বছর ধরে আর্মি রিজার্ভে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার এক আত্মীয় সামাজিক মাধ্যমে তাকে অত্যন্ত স্নেহশীল এবং পরিশ্রমী মানুষ হিসেবে স্মরণ করেছেন। রবার্ট মারজানের বোন তাকে একজন শক্তিশালী নেতা এবং ভালোবাসাপূর্ণ স্বামী ও পিতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সবচেয়ে কমবয়সী নিহত সেনা ডেকলান কোডি সামরিক কম্পিউটার সিস্টেম নিয়ে কাজ করার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। তার বাবা অ্যান্ড্রু কোডি বলেন, তিনি কঠোর পরিশ্রমী এবং অত্যন্ত সদয় স্বভাবের একজন মানুষ ছিলেন। ক্যাপ্টেন কোডি খর্কের পরিবার তাকে প্রাণবন্ত ও উদার হৃদয়ের মানুষ হিসেবে স্মরণ করেছে, যিনি ছোটবেলা থেকেই সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।
সার্জেন্ট ফার্স্ট ক্লাস নোয়া টিটজেন্স সামরিক পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন এবং অতীতে কুয়েতে তার বাবার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার পরিবার ও স্বজনরা এই গভীর শোকের সময়ে সবার কাছে প্রার্থনা কামনা করেছেন।