
২৪ এপ্রিল সিনেমাহলে আসছে "মাইকেল" — বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত পপ তারকার জীবনের গল্প। ট্রেলার দেখলে মনে হয় এটি হবে এক মহাকাব্যিক উদযাপন — মঞ্চের ঝলকানো আলো, অবিস্মরণীয় সব গান, একটি কিংবদন্তির জন্মের গল্প। কিন্তু ক্যামেরার পেছনে, এডিটিং টেবিলে, গত কয়েক মাস ধরে এমন কিছু ঘটে গেছে যা জানলে যেকোনো দর্শকের মাথায় একটাই প্রশ্ন জাগবে — এটা কি বায়োপিক, নাকি সরকারি প্রচারণা?
গল্পটা শুরু হয় একটি পুরনো কাগজের টুকরো থেকে।
জ্যাকসন এস্টেটের আইনজীবীরা নথিপত্র ঘাঁটতে গিয়ে হঠাৎ একটি ধারা আবিষ্কার করলেন — দশকের পুরনো, প্রায় ভুলে যাওয়া। ১৯৯০-এর দশকের গোড়ায় মাইকেল জ্যাকসনের বিরুদ্ধে শিশু যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনেছিলেন জর্ডান চ্যান্ডলার। সেই মামলার আপোষ নিষ্পত্তিতে এস্টেটের সাথে একটি চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তিতে লুকিয়ে ছিল একটি ধারা — চ্যান্ডলারের নাম বা পরিচয় কোনো চলচ্চিত্রে ব্যবহার করা যাবে না।
একটি ছোট্ট আইনি বাক্য। কিন্তু তার প্রভাব হলো বিশাল।
রাতারাতি সিদ্ধান্ত হলো — ছবির শেষ তৃতীয়াংশ, যেখানে বিস্তারিতভাবে শিশু নিপীড়নের অভিযোগের কথা ছিল, সেটা পুরোপুরি বাদ। ছবির শুরুতে যে দৃশ্যে পুলিশ নেভারল্যান্ড র্যাঞ্চে হানা দিচ্ছে — সেটাও বাদ। সব মিলিয়ে দেড় কোটি ডলারের রিশুট হলো। এস্টেটের তিনশো কোটি ডলারের সম্রাজ্যের কাছে সেটা পকেটের খুচরো পয়সা।
কিন্তু যা মুছে দেওয়া হলো, সেটা কি সত্যিই মুছে যায়? - মাইকেল জ্যাকসনের জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়টি ছিল নেভারল্যান্ড। সেই রহস্যময় বাড়িতে ৭ বছর বয়সী শিশুরা এসে রাত কাটাত তার বিছানায়। প্রাইভেট জেটে করে প্যারিস যেত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফরে যেত তার সাথে। এই সবকিছু সম্পর্কে জ্যাকসনের নিজস্ব ব্যাখ্যা ছিল — তিনি বলতেন শিশুদের প্রতি তার ভালোবাসা নির্মল, পবিত্র। কিন্তু ২০১৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ডকুমেন্টারি "লিভিং নেভারল্যান্ড" সেই দাবিকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ — ওয়েড রবসন ও জেমস সেফচাক — বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছিলেন কীভাবে শৈশবে তারা নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন।
সেই ডকুমেন্টারির পর বিশ্বজুড়ে বহু রেডিও স্টেশন জ্যাকসনের গান বাজানো বন্ধ করে দিয়েছিল। তুমুল বিতর্ক হয়েছিল। প্রশ্ন উঠেছিল — শিল্পী ও শিল্পকে কি আলাদা করা যায়?
এস্টেট সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজল না। বরং প্রশ্নটাকেই মুছে দেওয়ার চেষ্টা করল। "মাইকেল" ছবির নির্মাতারা এখন যে পথে হাঁটছেন, সেটা নতুন নয়। ব্রডওয়ে মিউজিক্যাল "এমজে" একই কৌশল নিয়েছিল — ১৯৯২ সালের "ড্যাঞ্জারাস" ট্যুরের রিহার্সালকে কেন্দ্র করে গল্প সাজানো হয়েছিল। সেই সময়কাল বেছে নেওয়ার কারণ স্পষ্ট — ওই সময়টার আগে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছিল না। ফলে দর্শকেরা আনন্দে মেতে উঠতে পারলেন বিবেকের কোনো দংশন ছাড়াই। সেই মিউজিক্যাল টনি পুরস্কারে মনোনীত হয়েছিল, লিড অ্যাক্টর পুরস্কার পেয়েছিলেন। আজও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মঞ্চায়িত হচ্ছে।
ব্যবসাটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। শিশু নিপীড়নের গল্প টিকিট বিক্রি বাড়ায় না। "বিলি জিন" আর "স্মুদ ক্রিমিনাল" বাড়ায়। কিন্তু একটি বায়োপিক — একটি সত্যিকারের জীবনের ছবি — সেটা কি শুধু টিকিট বিক্রির জন্য? একটি বায়োপিকের কাছে দর্শকের প্রত্যাশা থাকে সত্যের মুখোমুখি হওয়ার। জটিল, অস্বস্তিকর, কখনো ভয়াবহ সত্যের।
মাইকেল জ্যাকসনের ভাগ্নে জাফার জ্যাকসন — জার্মেইনের ২৯ বছর বয়সী ছেলে — মূল ভূমিকায় অভিনয় করছেন। রক্তের টান আছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সেই রক্তের টানই প্রশ্ন তোলে — একজন পরিবারের সদস্য কি নিরপেক্ষভাবে, সৎভাবে এই চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে পারবেন?
ছবিটি সম্ভবত বক্স অফিসে ঝড় তুলবে। "বোহেমিয়ান র্যাপসোডি" সারা বিশ্বে ৯০ কোটি ডলার আয় করেছিল — সেটাই লক্ষ্য। নস্টালজিয়া বিক্রি হয়। হিটগানের গান বিক্রি হয়। বিশেষ করে যখন সেই গানগুলোর পাশে থাকা অন্ধকারকে সযত্নে সরিয়ে রাখা হয়। কিন্তু একটা কথা নিশ্চিত — এই ছবির একটিও সমালোচনা এই বাদ দেওয়ার ঘটনাকে উপেক্ষা করতে পারবে না। প্রতিটি রিভিউতে সেই প্রশ্ন থাকবে — কেন কাটা হলো? কী লুকানো হলো? কার স্বার্থে?
শিল্পী ও শিল্পকে আলাদা রাখা যায় কিনা সেটা দার্শনিক তর্ক। কিন্তু একটি বায়োপিকে একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় মুছে দেওয়া — সেটা আর শিল্পের প্রশ্ন নয়। সেটা ইতিহাস বিকৃতির প্রশ্ন।
মাইকেল জ্যাকসনের সঙ্গীত চিরকাল টিকে থাকবে — কেউ সেটা অস্বীকার করছে না। "থ্রিলার" বা "বিলি জিন" শুনলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়। কিন্তু সেই অসাধারণ প্রতিভার আড়ালে যে অন্ধকার লুকিয়ে ছিল — সেটাকে চিরতরে মুছে ফেলার যে চেষ্টা হচ্ছে — সেটাই এই ছবিকে একটি অস্বস্তিকর দলিল বানিয়ে দিচ্ছে।
২৪ এপ্রিল পর্দায় আলো জ্বলবে। মাইকেল নাচবেন, গাইবেন, মঞ্চ মাতাবেন। কিন্তু নেভারল্যান্ডের সেই ছোট্ট ছেলেগুলোর মুখ — যারা কেউ জানুক বা না জানুক, সিনেমার পর্দায় না থাকলেও ইতিহাসের পাতায় আছে — তারা কোথাও না কোথাও থেকেই যাবে।
কিছু সত্য মুছে দেওয়া যায় না।