
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের একাধিক গোপন কূটনৈতিক তার ফাঁস হয়েছে, যা দেখাচ্ছে ইরান যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে আমেরিকার কৌশলগত সম্পর্ক ও সুনামে মারাত্মক ক্ষতি করছে। পলিটিকো সংগ্রহ করা এই তারবার্তাগুলো গত বুধবার পাঠানো হয়েছে এবং এগুলোতে তিনটি দেশ — বাহরাইন, আজারবাইজান ও ইন্দোনেশিয়া — থেকে পাঠানো মার্কিন দূতাবাসগুলোর উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। বিভিন্ন প্রান্তে ইরানপন্থী প্রচারণা যখন ডিজিটাল স্পেসে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, তখন মার্কিন দূতাবাসগুলো হোয়াইট হাউসের অনুমোদিত বার্তার বাইরে কিছু বলতে পারছে না — এই সংকটই এই তারবার্তাগুলোর মূল কথা।
বাহরাইনে পরিস্থিতি হয়তো সবচেয়ে বিব্রতকর। যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দফতর এই উপসাগরীয় দেশে। কিন্তু মানামা থেকে পাঠানো তারবার্তায় বলা হয়েছে, ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে জনসাধারণের মনে এই ধারণা তৈরি হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সুরক্ষায় মনোযোগ দিতে গিয়ে বাহরাইনকে একা ছেড়ে দিয়েছে। ইরানপন্থী সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টগুলো প্রশ্ন তুলছে — মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাহরাইনকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে কিনা এবং সেই বাহিনী কি দেশ ছাড়া উচিত। একটি বহুলপ্রচারিত টুইটে প্রশ্ন করা হয়েছে, "যে আমেরিকা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য গালফকে ছেড়ে দিয়েছে, তারা কি বাহরাইনের মানুষকে ঝুঁকিতে ফেলার যোগ্য?" তারবার্তায় আরও বলা হয়েছে, বাহরাইনের সরকারি মিডিয়া তাদের সামরিক বাহিনীর সাফল্যের খবর দিয়েছে কিন্তু মার্কিন সহায়তার কথা উল্লেখ করেনি — ফলে মানুষ বুঝতেই পারছে না যুক্তরাষ্ট্র আসলে কতটা সাহায্য করেছে। পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে ব্রিটিশ দূতাবাসের সক্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া উপস্থিতি, যা এমন ধারণা তৈরি করেছে যে যুক্তরাজ্য যেখানে এগিয়ে আসছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে যাচ্ছে।
আজারবাইজানে সম্পর্কের উন্নতির চাকা উল্টো দিকে ঘুরছে। গত আগস্টে ট্রাম্পের উদ্যোগে আজারবাইজান-আর্মেনিয়া শান্তি সম্মেলনের পর দেশটিতে মার্কিন-পন্থী সংবাদ মাধ্যমের কভারেজ বেড়েছিল এবং মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ আজারবাইজানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছিল। ইরান যুদ্ধ শুরুর প্রথম মাসে আজারবাইজানি মিডিয়া মোটামুটি নিরপেক্ষ ছিল। এমনকি ৫ মার্চ একটি ইরানি ড্রোন হামলার পর আজারবাইজানি জাতীয়তাবাদীরা ইরানকে "সন্ত্রাসী" বলে তুলোধুনো করেছিল। কিন্তু এপ্রিল মাসে হাওয়া বদলাল। বাকু থেকে পাঠানো তারবার্তায় বলা হয়েছে, বেশিরভাগ স্থানীয় গণমাধ্যম এখন মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করছে এবং ট্রাম্প ও তার পরিবারের সমালোচনামূলক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন পুনরায় প্রকাশ করছে — যা সরকারি ইচ্ছার ইঙ্গিত দেয়। তবে যুদ্ধবিরতির পর পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে এবং অনেক আজারবাইজানি নাগরিক চাইছেন সংঘাত শেষ হোক।
ইন্দোনেশিয়ায় ইরানের প্রভাব অভিযান সবচেয়ে সুসংগঠিত এবং সবচেয়ে উদ্বেগজনক। বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ গণতন্ত্রে ইরান টেলিগ্রাম, ফেসবুকসহ একাধিক প্ল্যাটফর্মে মুসলিম সংহতির বার্তা দিচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে চিত্রিত করে ঔপনিবেশিকতাবিরোধী অনুভূতিকে কাজে লাগাচ্ছে। জাকার্তার তারবার্তায় বলা হয়েছে, ইরানি দূতাবাসের পোস্টগুলো এখন আগের চেয়ে হাজার হাজার বেশি ভিউ ও পজিটিভ মন্তব্য পাচ্ছে। ইরানের রাষ্ট্রদূত রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক অভিজাতদের সঙ্গে সাক্ষাৎ বাড়িয়েছেন। কিছু ইরানপন্থী কনটেন্ট মোর্স কোড ব্যবহার করে দর্শকদের মধ্যে ইন্টারেক্টিভ সম্পৃক্ততা তৈরি করছে — যা এই প্রচারণার সৃজনশীলতার ইঙ্গিত দেয়। জাকার্তার তারবার্তায় সতর্ক করা হয়েছে যে যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় তাহলে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোওর পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে পড়বে। উল্লেখ্য, সোমবারই ইন্দোনেশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বড় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।
তারবার্তাগুলোর সবচেয়ে বিরক্তিকর দিক হলো, মার্কিন দূতাবাসগুলো ইরানের ডিজিটাল আক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে পাল্টা জবাব দিতে পারছে না। হোয়াইট হাউস বা পররাষ্ট্র দফতরের অনুমোদিত বার্তার বাইরে মূল কনটেন্ট তৈরি করতে নিষেধ করা হয়েছে। জাকার্তার তারবার্তায় সরাসরি বলা হয়েছে, দূতাবাসের "নমনীয়, দ্রুত ও প্রসক্রিয়" সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবস্থাপনার স্বাধীনতা দরকার। ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে অনেক ফরেন সার্ভিস অফিসার হয় বরখাস্ত হয়েছেন অথবা মুখ বন্ধ রাখছেন — কারণ বিদেশনীতির সমালোচনা করলে প্রতিশোধের ভয় আছে। এই পরিবেশে এই তারবার্তাগুলো পাঠানো হয়েছে — যা নিজেই পরিস্থিতির গুরুতরতার ইঙ্গিত।
পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র টমি পিগট বলেছেন, "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পদক্ষেপ ইরানী শাসনকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রেখে যুক্তরাষ্ট্র, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং সমগ্র বিশ্বকে নিরাপদ করছে।" কিন্তু মাঠ পর্যায়ের কূটনীতিকদের পাঠানো এই তারবার্তাগুলো সেই আধিকারিক আশাবাদের সঙ্গে বাস্তবতার বিস্তর ফারাক দেখিয়ে দিচ্ছে।