
যুক্তরাষ্ট্রের কর আদায়কারী সংস্থা ইন্টারনাল রেভিনিউ সার্ভিস বা আইআরএস প্রায় ৪৭ হাজার করদাতার ঠিকানা অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে দিয়ে ফেডারেল আইন লঙ্ঘন করেছে বলে রায় দিয়েছেন একটি আপিল আদালত। একই সঙ্গে আইআরএস ও ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসের মধ্যে করদাতাদের তথ্য বিনিময়ের নীতি বন্ধে নিম্ন আদালতের দেওয়া প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, মঙ্গলবার ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া সার্কিটের ইউএস কোর্ট অব আপিলসের তিন বিচারকের একটি প্যানেল সর্বসম্মতভাবে এ সিদ্ধান্ত দেন। আদালত বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে তৈরি তথ্য বিনিময় পদ্ধতিটি করদাতাদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষাকারী ফেডারেল আইনের একাধিক শর্ত লঙ্ঘন করেছে।
আপিল আদালতের নথির তথ্যমতে, আইস ২০২৫ সালে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের সন্দেহ এবং চূড়ান্ত বহিষ্কার আদেশ অমান্য করার অভিযোগে প্রায় ১২ লাখ ৮০ হাজার ব্যক্তির সর্বশেষ ঠিকানা চেয়ে আইআরএসের কাছে অনুরোধ পাঠায়। এসব অনুরোধ প্রক্রিয়া করে আইআরএস আইসের কাছে ৪৭ হাজার ২৮৯টি করদাতা নথি প্রকাশ করে।
আইআরএস ও আইসের মধ্যে হওয়া চুক্তির অধীনে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে এসব অনুরোধ প্রক্রিয়াকরণ শুরু হয়। আদালত দেখতে পান, আইসের আবেদনের ঠিকানার ঘরে প্রকৃত ঠিকানা না থাকলেও শুধু পাঁচ অথবা নয় সংখ্যার একটি নম্বর দেওয়া হলে আইআরএস করদাতার তথ্য খুঁজে দিতে পারত। ওই নম্বর প্রকৃত জিপ কোড হওয়াও বাধ্যতামূলক ছিল না।
নিউজউইকের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, কিছু অনুরোধে ঠিকানার স্থানে ‘ঠিকানা অজানা’, ‘তথ্য দিতে ব্যর্থ’ অথবা প্রযোজ্য নয়, এমন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছিল। তারপরও কর শনাক্তকরণ নম্বরের সঙ্গে মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সর্বশেষ ঠিকানা আইসকে দেওয়া হয়।
আপিল আদালত জানায়, প্রকাশ করা নথির ৯০ শতাংশের বেশি কর শনাক্তকরণ নম্বরের সঙ্গে মিলিয়ে বের করা হয়েছিল। এসব ক্ষেত্রে আইস প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা দিয়েছিল কি না, তা আইআরএস যাচাই করেনি।
বিচারক কর্নেলিয়া পিলার্ড আদালতের পক্ষে দেওয়া মতামতে বলেন, এই তথ্য বিনিময় পদ্ধতি ইন্টারনাল রেভিনিউ কোডের ৬১০৩ ধারার শর্ত সরাসরি লঙ্ঘন করেছে। আইনে কোনো করদাতার তথ্য চাওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে তাঁর নাম ও ঠিকানা দেওয়াসহ কঠোর শর্ত পূরণ করতে হয়। কিন্তু আইআরএসের নতুন পদ্ধতিতে আইসকে প্রকৃত ঠিকানা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাই রাখা হয়নি।
ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির সময় সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে করদাতাদের তথ্য অপব্যবহারের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর কংগ্রেস করসংক্রান্ত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষায় কঠোর আইন প্রণয়ন করেছিল। সীমিত কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অন্য সরকারি সংস্থার কাছে এসব তথ্য প্রকাশ নিষিদ্ধ করা হয়।
আদালত আরও বলেন, আইআরএসের পদ্ধতিতে লাখ লাখ নথি স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করা হয়েছে। তথ্য প্রকাশের আগে প্রতিটি ব্যক্তির ক্ষেত্রে আইনি শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা পৃথকভাবে নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না।
সেন্টার ফর ট্যাক্সপেয়ার রাইটস, মেইন স্ট্রিট অ্যালায়েন্স এবং দুটি শ্রমিক সংগঠন নীতিটির বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। নিম্ন আদালত নীতিটি বন্ধে প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আগেই ৪৭ হাজারের বেশি নথি আইসের কাছে পৌঁছে যায়।
নিউজউইককে দেওয়া বিবৃতিতে সেন্টার ফর ট্যাক্সপেয়ার রাইটস বলেছে, আদালত করদাতাদের তথ্যের গোপনীয়তার মৌলিক অধিকার বহাল রেখেছেন। করদাতাদের তথ্য সুরক্ষায় কংগ্রেস যে নির্দিষ্ট বিধান তৈরি করেছে, ট্রেজারি বিভাগ ও আইআরএস নিজেদের সিদ্ধান্তে তা পাশ কাটিয়ে যেতে পারে না।
বাদীপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, যেসব করদাতার তথ্য বেআইনিভাবে দেওয়া হয়েছে, তাঁদের বিষয়টি জানানো প্রয়োজন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের দাবি জানানোর সুযোগ পেতে পারেন।
ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির একজন মুখপাত্র আদালতের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, চূড়ান্ত বহিষ্কার আদেশ থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত ও অপসারণে সরকার আইনসম্মত সব ব্যবস্থা ব্যবহার অব্যাহত রাখবে। এই রায় আইসের অন্যান্য আইনসম্মত অভিবাসন প্রয়োগ কার্যক্রম বন্ধ করছে না বলেও জানান তিনি। আইআরএস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
এই রায় মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নয়। এটি তথ্য বিনিময় বন্ধে দেওয়া প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত। তবে আপিল আদালত বলেছে, বাদীপক্ষ মূল মামলায় প্রমাণ করতে সক্ষম হতে পারে যে আইআরএসের নীতিটি ফেডারেল আইন লঙ্ঘন করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালত অথবা সুপ্রিম কোর্টে যেতে পারে।