
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পাবেন না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তে তার প্রভাব বিবেচনায় রাখতে পারে নরওয়ের নোবেল কমিটি।
গত বছর ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। ১২৫ বছরের ইতিহাসে ওই পুরস্কারকে ব্যতিক্রমী বলে মনে করা হয়। কারণ, ট্রাম্প নিজে পুরস্কারটি পাওয়ার জন্য একাধিকবার প্রচার চালিয়েছিলেন। পুরস্কার পাওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর মাচাদো তার নোবেল পদক ট্রাম্পকে দেন। ভেনেজুয়েলায় গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রচেষ্টায় ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়ার লক্ষ্যেই তিনি এটি করেন বলে মনে করা হয়।
এবার নোবেল শান্তি পুরস্কারের পাঁচ সদস্যের কমিটি এমন কাউকে পুরস্কার দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকবে, যিনি ট্রাম্পের চাপ মোকাবিলা করতে পারবেন। এমনটাই মনে করছেন পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলোয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হাকন গেরলোভ।
তিনি রয়টার্সকে বলেন, গত বছরের ঘটনা এবার কমিটির সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তিকে পুরস্কার দিলে তার ওপর ট্রাম্পের চাপ তৈরি হবে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। চলতি বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কারের ঘোষণা হবে ৯ অক্টোবর।
কারা পেতে পারেন পুরস্কার?
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় রয়েছেন পোপ লিও, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি), আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজ।
যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া প্রথম পোপ লিও যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলে আসছেন। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সমালোচনা করায় ট্রাম্প তাকে ‘দুর্বল’ বলেও মন্তব্য করেছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে পোপের প্রকাশিত বক্তব্য, সংলাপ ও শান্তিপূর্ণভাবে সংঘাতের সমাধানের পক্ষে অবস্থান, অভিবাসীদের অধিকার এবং মানবিক কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্য হতে পারেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক করিম হাগাগ বলেন, পোপ শুধু ধর্মীয় নেতা হিসেবে নয়, বিশ্বপর্যায়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ হিসেবেও উঠে এসেছেন।
অন্যদিকে ফ্রান্সেসকা আলবানিজ গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও পশ্চিম তীরে দখলদারিত্বের সমালোচনা করে আসছেন। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমালোচনার মুখেও পড়েছেন তিনি।
তুলনামূলক নিরাপদ প্রার্থীও হতে পারেন
তবে গত বছরের বিতর্কের পর নোবেল কমিটি তুলনামূলক কম বিতর্কিত কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনকেও বেছে নিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি বিরোধে জড়ানোর ঝুঁকি কম থাকবে।
এ ক্ষেত্রে সুদানের ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস’ পুরস্কারের জন্য বিবেচনায় আসতে পারে। গৃহযুদ্ধের মধ্যে সুদানের বিভিন্ন স্থানীয় সংগঠনের এই নেটওয়ার্ক সাধারণ মানুষকে সহায়তা দিয়ে আসছে। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় শিশুদের জন্য কাজ করা আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনও আলোচনায় রয়েছে।
তবে নোবেল কমিটির ওপর আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষার বিষয়েও অবস্থান নেওয়ার চাপ রয়েছে বলে মনে করেন নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে গবেষণা করা ইতিহাসবিদ ওইভিন্দ স্টেনারসেন।
তিনি বলেন, বর্তমান গুরুতর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে উদার গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার মতো একটি শান্তি পুরস্কার দেওয়া প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে পুরস্কার দেওয়া হলে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করা হবে। একইভাবে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতকে পুরস্কার দিলে রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব ও শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রতি সমর্থন জানানো হবে।
ট্রাম্পের সম্ভাবনা কতটা?
কম্বোডিয়া, ইসরায়েল ও পাকিস্তানের নেতারা ট্রাম্পকে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে তার পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা ‘খুবই কম’ বলে মনে করেন হাকন গেরলোভ।
নোবেল কমিটির ওপর ট্রাম্পের চাপ প্রয়োগের বিষয়টি অনেককেই বিস্মিত করেছে। নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ফিলিপাইনের সাংবাদিক মারিয়া রেসাও এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
রয়টার্সকে তিনি বলেন, বিশ্বের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কোনো ‘বুলির’ হাতে থাকা উচিত নয়। শক্তিশালী হলেই কোনো কিছু সঠিক হয়ে যায় না।
সূত্র : এনডিটিভি