
চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও যশোরের এক তৃতীয়াংশ প্রার্থী অপরিচিত মুখ। তাদের অনেকেই ঠিকমতো চেনেন না ভোটাররা। অনেকেই জানেন না তাদের আসনে কত জন প্রার্থী। কারণ বেশিরভাগ প্রার্থী এলাকায় প্রচারণা চালাননি। এমনও প্রার্থী আছেন, যাদের দেখেননি বলে জানালেন ভোটাররা। আবার কেউ কেউ প্রচারণা চালালেও সব এলাকায় যাননি। ফলে বিএনপি-জামায়াত ও কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাড়া বাকিদের ভোট দেওয়ার ব্যাপারে তেমন কোনও আগ্রহ নেই ভোটারদের।
চট্টগ্রামের ১৬ আসনে ১১৫ প্রার্থী, প্রচারণার মাঠে ছিলেন না অনেকেই
চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে এবারের নির্বাচনে ২৫টি রাজনৈতিক দলের ১১৫ জন প্রার্থী নির্বাচন করছেন। এসব আসনে বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থীদের সরব উপস্থিতি ও প্রচারণা চোখে পড়লেও অন্যদের কার্যক্রম ছিল সীমিত। মনোনয়ন পেলেও তারা মাঠে বড় দলের প্রার্থীদের মতো প্রচারণা চালাতে পারেননি। বিশেষ করে ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ব্যানার, লিফলেট, পথসভা কিংবা গণসংযোগ তেমন দৃশ্যমান ছিল না। ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটারদের বড় একটি অংশের কাছে তারা অপরিচিতি থেকে গেছেন।
চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই) আসনে সাত জন প্রার্থী। আসনটিতে বিএনপির নুরুল আমিনের সঙ্গে জামায়াতের ছাইফুর রহমানের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা। তারা বলছেন, আসনটিতে বিএনপি-জামায়াত প্রার্থী যে পরিসরে রাত-দিন প্রচারণা চালিয়েছেন সে অনুযায়ী জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের এ কে এম আবু ইউছুপ, ইনসানিয়াত বিপ্লবের রেজাউল করিম, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের শেখ জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী ও জাতীয় পার্টির সৈয়দ শাহাদাৎ হোসেনকে সেভাবে প্রচারণার মাঠে দেখেননি। যে কারণে এসব প্রার্থী এলাকার মানুষের কাছে পরিচিত নন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের এ কে এম আবু ইউছুপ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার দল ছোট, প্রার্থী হিসেবে গরিব। যদিও যোগ্যতার দিক থেকে ছোট নয়। বড় দলগুলো যেভাবে প্রচারণা চলিয়েছে সেভাবে প্রচারণা চালানো আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাদের মতো প্রচারণা চালানোতে আমরা অভ্যস্তও নই। জনগণ যদি আমাকে ভালো মনে করে তাহলে ভোট দেবেন। এরপরও আমি চেষ্টা করেছি এই আসনের ১৬টি ইউনিয়নের গণসংযোগ করার।’
চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে আট জন লড়ছেন। ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই আসনে ত্রিমুখী লড়াই হবে বিএনপি, জামায়াত এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির মধ্যে। এখানে বিএনপি, জামায়াত ও সুপ্রিম পার্টির প্রার্থী যেভাবে গ্রামের ঘরে ঘরে কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছে, সেভাবে প্রচারণা চোখে পড়েনি গণঅধিকার পরিষদের রবিউল হাসানের, জনতার দলের গোলাম নওশের আলীর ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আহমদ কবিরের। এজন্য চেনেন না তাদের।
চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে চার জন নির্বাচন করছেন। এখানে বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে লড়াই হবে বলছেন ভোটাররা। তুলনামূলক কম প্রচারণা চালিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মোয়াহেদুল মাওলা। এজন্য অপরিচিত থেকে গেছেন।
চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে নয় জন প্রার্থী। বিএনপি এবং জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা। তবে তাদের কাছে অপরিচিত থেকে গেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মো. মছিউদদৌলা, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মো. জাকারিয়া খালেদ, গণঅধিকার পরিষদের এ টি এম পারভেজ ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মো. সিরাজুদ্দৌলা।
চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে ছয় জন প্রার্থী। বিএনপির সঙ্গে খেলাফত মজলিসের প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে বলে মনে করছেন ভোটাররা। এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ মোক্তার আহমেদ ও বাংলাদেশ লেবার পার্টির মো. আলাউদ্দিনের প্রচারণা কম চোখে পড়েছে। তারা এলাকার মানুষের কাছে বেশি পরিচিত নন বলে জানিয়েছেন ভোটাররা।
চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে চার জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এখানে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী গিয়াস কাদের চৌধুরী লড়ছেন। তার তুলনায় অন্যান্য দলের প্রার্থী জনসমর্থনের দিক থেকে কিছুটা পিছিয়ে। এখানে গণসংহতি আন্দোলনের নাছির উদ্দীনের প্রচারণা কম দেখেছেন ভোটাররা।
গহিরা এলাকার বাসিন্দা ওমর ফারুক বলেন, ‘নাছির উদ্দীন এলাকার মানুষের কাছে তেমন পরিচিত নন। তার প্রচারণাও চোখে পড়েনি। তিনি যে প্রার্থী তা আমরা অনেকেই জানি না।’
চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে আট জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই আসনে বিএনপি প্রার্থীর সঙ্গে জামায়াতের প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে বলে মনে করছেন ভোটাররা। এখানে কমিউনিস্ট পার্টির প্রমোদ বরণ বড়ুয়া, এবি পার্টির মো. আবদুর রহমান ও গণঅধিকার পরিষদের বেলাল উদ্দীনের প্রচারণা তেমন দেখেননি ভোটাররা। এসব প্রার্থী এলাকার মানুষের কাছে কম পরিচিত বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন।
চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁও-বোয়ালখালী) আসনে ছয় প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই আসনে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে বিএনপি। কারণ জামায়াত জোট থেকে এনসিপিকে আসনটি ছেড়ে দিলেও ব্যালটে প্রতীক আছে দাঁড়িপাল্লা। এই কারণে মূলত বিএনপির প্রার্থী মাঠে এগিয়ে আছেন। তবে ইনসানিয়াত বিপ্লবের এমদাদুল হকের প্রচারণা কিছুটা কম দেখা গেছে বলে ভোটাররা জানিয়েছেন।
চট্টগ্রাম-৯ (পাঁচলাইশ-বাকলিয়া-কোতোয়ালি) আসনে ১০ জন নির্বাচন করছেন। বিএনপি এবং জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা। বাকি প্রার্থীদের অনেকেই অপরিচিত থেকে গেছেন। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের আবদুল মোমেন চৌধুরী, ইনসানিয়াত বিপ্লবের মোহাম্মদ নঈম উদ্দীন, নাগরিক ঐক্যের মো. নুরুল আবছার মজুমদার ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের মো. শফি উদ্দিন কবিরের প্রচারণা কম দেখা গেছে। এজন্য সব ভোটারের কাছে তারা পরিচিত হয়ে উঠতে পারেননি।
চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-পাহাড়তলী-আকবরশাহ) আসনে নয় জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপি এবং জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে বলে মনে করছেন ভোটাররা। তারা বলছেন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের আসমা আকতার, জাতীয় পার্টির মুহাম্মদ এমদাদ হোসাইন চৌধুরী, স্বতন্ত্র মোহাম্মদ আরমান আলী ও বাংলাদেশ লেবার পার্টির মো. ওসমান গণির প্রচারণা তেমন ছিল না। আসনটির অনেক এলাকার মানুষ তাদের অনেকের চেহারাও দেখেননি বলে জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের আসমা আকতার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কিছু দল ঘোড়া নিয়ে, ব্যান্ড পার্টি নিয়ে, সাজসজ্জায় যেভাবে টাকা খরচ করেছে আমি তার পক্ষে নই। জনগণের টাকায় আমরা নির্বাচন করছি। যতটুকু পেরেছি জনগণের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। এখন জনগণই এর মূল্যায়ন করবে।’ একই অবস্থা জেলার বাকি আসনগুলোতেও। বিএনপি-জামায়াতের বাইরের প্রার্থীরা অপরিচিত।
রাজশাহীতে বিএনপি-জামায়াত ও বিদ্রোহী প্রার্থী ছাড়া অন্যদের চেনেন না ভোটাররা
রাজশাহীর ছয়টি আসনে এবার একজন নারীসহ ৩২ জন প্রার্থী। এর মধ্যে ২৬ জনই দলীয়। বাকিরা হচ্ছেন বিএনপির বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র। এদের বাইরে অন্যদের প্রচারণা কম থাকায় ছয়টি আসনে বাকি প্রার্থীদের চেনেন না অধিকাংশ ভোটার।
রাজশাহী জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্যমতে, ছয়টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৩২ প্রার্থী। এর মধ্যে ২৬ জনই দলীয়। স্বতন্ত্র প্রার্থী আছেন ছয় জন। তার মধ্যে রাজশাহী-১ আসনে পাঁচ জন, রাজশাহী-২ আসনে ছয় জন, রাজশাহী-৩ আসনে ছয় জন, রাজশাহী-৪ আসনে চার জন, রাজশাহী-৫ আসনে সাত জন ও রাজশাহী-৬ আসনে চার জন।
রাজশাহী-১ আসনে পাঁচ জন প্রার্থী হলেও ভোটারদের মুখে মুখে ঘুরছে দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর নাম। এই আসনের তানোর উপজেলার ভোটার শরিফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতদের প্রার্থী ছাড়া অন্যদের তেমন প্রচারণা আমার চোখে পড়েনি। এমনকি তাদের আমরা চিনি না।’
সিটি করপোরেশনের ৩০টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত রাজশাহী-২ আসন। এই আসনের নগরীর হাদির মোড় এলাকার তরুণ ভোটার মাহামুদুল হাসান জানান, রাজশাহী-২ আসনে ছয় জন প্রার্থী। এর মধ্যে ধানের শীষের মিজানুর রহমান মিনু ও জামায়াতের প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে ভালোভাবে চিনি। বাকিদের তেমন চিনি না।
পদ্মা নদী ঘেরা রাজশাহীর দুই উপজেলা চারঘাট ও বাঘা। এই দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-৬ আসন। চারঘাট উপজেলার ভোটার নরুল আমিন বলেন, ‘আমার এলাকায় বিএনপি প্রার্থী আবু সাঈদ চাঁদকে ভালোভাবে চিনি। তাছাড়া অন্য প্রার্থীদের তেমন চিনি না।’
শুধু শরিফুল হাসান ও মাহামুদুল হাসান ছাড়াও অনেক ভোটার দলীয় প্রার্থীকে বেশি চেনেন। আবার অনেকে বিএনপি ও জামায়াতদের প্রার্থী ছাড়াও অন্য প্রার্থীদের চেনেন না।
রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি মিলিয়ে সাত জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে তিন জন স্বতন্ত্র। এই তিন জনের দুজনই বিএনপির ‘বিদ্রোহী’। দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়ানোয় তাদের ইতিমধ্যে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির প্রার্থী বেশি হওয়ায় দলটির ভোটব্যাংক তিন ভাগে বিভক্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এতে জামায়াতের প্রার্থী সুবিধা পেতে পারেন। তবে গত ২৮ ডিসেম্বর হঠাৎ করে জামায়াত প্রার্থী বদল করায় নতুন প্রার্থীকে ভোটারদের দোরগোড়ায় যেতে হচ্ছে। এতে একধরনের জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে আসনটিতে। এই আসনে জামায়াতের জেলা কমিটির সহকারী সেক্রেটারি নুরুজ্জামান লিটন প্রায় ১১ মাস ধরে নির্বাচনী গণসংযোগ ও প্রচার চালিয়েছেন। তার পরিবর্তে নতুন প্রার্থী করা হয়েছে পুঠিয়া উপজেলা জামায়াতের আমির মনজুর রহমানকে।
জামায়াতের প্রার্থী মনজুর রহমান বলেন, ‘তাদের (বিএনপি) তিন জন প্রার্থী। ভোট বিভিন্ন জায়গায় ভাগ হবে। এতে আমাদের সুবিধা তো হবেই। আমাদের ভোট তো থাকবেই, পাশাপাশি তাদের ভোটের একটি অংশও পাব বলে আশা করি।’ জামায়াতের প্রার্থী পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের মাঠ গোছানো আছে। আগের প্রার্থীও আমাদের সঙ্গে প্রচারণায় ছিলেন।’
রাজশাহী-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন পুঠিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ইসফা খায়রুল হক (ঘোড়া প্রতীক) ও যুক্তরাজ্য জিয়া পরিষদের সহসভাপতি রেজাউল করিম (ফুটবল প্রতীক)। তাদের সঙ্গে স্থানীয় কিছু নেতাকর্মীও সক্রিয় রয়েছেন।
তবে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, এই আসনের নেতাকর্মী ও ভোটাররা আমার সঙ্গেই আছেন। তারা ধানের শীষ দেখেই ভোট দেবেন। বিদ্রোহী প্রার্থীরা বিএনপির ভোট নিতে পারবেন না।’
পুঠিয়ার বিড়ালদহ মাজারের পাশে ছোট একটি বাজার। বাজারের উত্তর দিকে কিছু দূর এগোলেই বিদ্রোহী প্রার্থী ইসফা খায়রুল হকের বাড়ি। বাজারের প্রায় সব দোকানে দড়ি দিয়ে ধানের ছড়া ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। রাস্তার দুই পাশেও টাঙানো রয়েছে ধানের ছড়া ও ব্যানার-ফেস্টুন। এই এলাকায় ভোটাররা প্রকাশ্যে কার পক্ষে ভোট দেবেন, তা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন। একাধিক ভোটারের ভাষ্য, ইসফা খায়রুল হকের বাড়ি হওয়ায় তিনি স্বাভাবিকভাবেই এখানে কিছু ভোট পাবেন। তবে প্রকাশ্যে সমর্থন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।
যুক্তরাজ্য জিয়া পরিষদের সহসভাপতি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিম ফুটবল প্রতীক নিয়ে বিশেষভাবে সক্রিয় দুর্গাপুর উপজেলায়। দুই উপজেলায় তার ব্যানার-ফেস্টুন চোখে পড়লেও দুর্গাপুরে উপস্থিতি বেশি। তার বাড়ি এই উপজেলায়।
রেজাউল করিম বলেন, ‘এই আসনে পুঠিয়া ও দুর্গাপুর নিয়ে নির্বাচন। দুর্গাপুর থেকে এখনও কেউ সংসদ সদস্য হননি। ব্যক্তি ইমেজ নিয়ে মাঠে আছি। ১২ তারিখে তারেক রহমানকে এই আসন উপহার দিতে চাই।’
দুর্গাপুরের মো. আজাদ নামে এক তরুণ বলেন, ‘এবার ভালো প্রার্থী নেই। সবাই গতানুগতিক প্রচার-প্রচারণা করেছেন। ভালো লাগলে ভোটকেন্দ্রে যাবো।’
রাজশাহী-৫ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫৩ হাজার ১৭৩ জন। নারী ভোটারই অর্ধেক। পুঠিয়ার শিবপুর বাজারে কয়েকজন প্রবীণ ভোটারদের মতে, প্রার্থী বেশি হওয়ায় ভোটারের উপস্থিতি বাড়তে পারে। তবে বিএনপির ভোট ভাগ হলে জামায়াতের প্রার্থী সুবিধা পাবেন।
ষাটোর্ধ্ব সোহরাব হোসেন বলেন, এবার সমীকরণ আলাদা। ধানের শীষের একক প্রার্থী হলে সহজে জিততো। এখন প্রার্থী তিন জন। জামায়াতের প্রার্থীও বদলেছে। ভোটের দিনই বোঝা যাবে, কী হয়।
বরিশালেও অনেক প্রার্থী অপরিচিত
বরিশাল-১ আসনে প্রার্থী পাঁচ জন। এর মধ্যে বিএনপি, বিএনপির বিদ্রোহী, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীদের প্রচারণা থাকলেও দেখা মেলেননি জেপির প্রার্থী সেরনিয়াবাদ সেকেন্দারের।
বরিশাল-২ আসনে প্রার্থী নয় জন। এর মধ্যে জাসদের আবুল কালাম আজাদ বাদল, এনপিপির সাহেব আলী রনি, জেপির আব্দুল হক, জাপার এম এ জলিল ও গণঅধিকার পরিষদের রনজিত কুমার বাড়ৈকে প্রচারণার মাঠে পাননি ভোটাররা। ফলে ভোটারদের কাছে তারা অপরিচিত থেকে গেছেন।
বরিশাল-৩ আসনে ছয় জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক মার্কার প্রার্থী ফারজান ইয়ামিন ও বাসদের মই মার্কার প্রার্থী আজমুল হাসানকে প্রচারণার মাঠে তেমন একটা দেখেননি ভোটাররা।
বরিশাল-৪ আসনে প্রার্থী পাঁচ জন। প্রচারণায় ছিলেন না জাসদ প্রার্থী আব্দুস সালাম খোকন ও জনকল্যাণ পার্টির আব্দুল জলিল। ফলে তারা অপরিচিত ভোটারদের কাছে।
বরিশাল-৫ আসনে মোট প্রার্থী ছয় জন। তবে প্রচারণার মাঠে দেখা মেলেনি জাতীয় পার্টির আখতার হোসেন, এনপিপির আব্দুল হান্নান সিকদার, বাসদের সাইদুর রহমানের।
বরিশাল-৬ আসনে প্রার্থী ছয় জন। এর মধ্যে তিন প্রার্থীকে প্রচারণার মাঠে পাননি এলাকাবাসী। তারা হলেন মুসলিম লীগের মুফতি আব্দুল কুদ্দুস, গণঅধিকার পরিষদের সালাউদ্দিন মিয়া ও স্বতন্ত্র কামরুল ইসলাম।
এ ব্যাপারে বরিশাল সদর আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আখতার হোসেন বলেন, ‘বড় দলের নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণা যেভাবে চোখে পড়ে আমার প্রচার-প্রচারণা আপনাদের মনে হয় সেভাবে চোখে পড়েনি। আমি মাইকিং থেকে শুরু করে লিফলেট বিতরণ করেছি। ভোটারদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছি।’
জাসদ প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমি ধানের শীষের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচনি মাঠ থেকে সরে দাঁড়িয়েছি। এ কারণে আমার প্রচার-প্রচারণা তেমন একটা ছিল না।’
খুলনাতেও একই অবস্থা
খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় ৩৬টি আসনে ৩৫টি প্রতীকে ২০৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন ২৬ জন। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা লড়ছেন আটটি প্রতীকে। বাকি ২৭টি প্রতীক দলীয়। বিএনপির ধানের শীষে ৩৬ জন ও জামায়াতের দাঁড়িপাল্লার ৩৫ জনের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। বাকি প্রার্থীদের বেশিরভাগ অপরিচিত। তাদের অনেকে ভোটের মাঠে প্রচারণা চালাননি। এজন্য পরিচিত হতে পারেননি।
খুলনা-১ আসনে জাতীয় পার্টির জাহাঙ্গীর হোসেন, জেএসডির প্রসেনজিৎ দত্ত, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির প্রবীর গোপাল রায়, বাংলাদেশ সমঅধিকার পরিষদের সুব্রত মন্ডল, স্বতন্ত্র গোবিন্দ হালদার ও গণঅধিকার পরিষদের জি এম রোকনুজ্জামান তুলনামূলক কম পরিচিত ও প্রচারণা কম চালিয়েছেন।
খুলনা-২ আসনে তিন প্রার্থীর মধ্যে বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জু, জামায়াতে ইসলামীর শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল ও ইসলামী আন্দোলনের মুফতি আমানুল্লাহ প্রচারণায় ছিলেন। এজন্য তিন জনই পরিচিত।
খুলনা-৩ আসনে স্বতন্ত্র মো. মুরাদ খান লিটন, মঈন মোহাম্মাদ মায়াজ, এনডিএমর শেখ আরমান হোসেন, জাতীয় পার্টির আব্দুল্লাহ আল মামুন, স্বতন্ত্র আবুল হাসানত সিদ্দিক প্রচারণায় তেমন সক্রিয় ছিলেন না। বাকি আসনগুলোতেই বিএনপি-জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীদের বাইরে দুই-তিন জন স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী ছাড়া বাকি প্রার্থীদের চেনেন না অধিকাংশ ভোটার।
ময়মনসিংহ জেলায় ১১টি আসনে ৬৭ প্রার্থীর অনেকে অপরিচিত
ময়মনসিংহ-১ আসনে প্রার্থী রয়েছেন ছয় জন। এর মধ্যে প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছেন বিএনপির সৈয়দ ইমরান সালে প্রিন্স, বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেল। এই দুই প্রার্থীর প্রচার-প্রচারণায় এই আসন বেশি দেখতে পেয়েছেন ভোটাররা। তবে অন্যদের প্রচার-প্রচারণা কম ছিল। তেমন পরিচিত নন তারা।
ময়মনসিংহ-২ আসনে সাত জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে বিএনপির মোতাহার হোসেন তালুকদার, স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহ শহীদ সারোয়ার এবং ১১ দলীয় জোটের খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদুল্লাহ প্রচার-প্রচারণায় এগিয়ে আছেন। অন্যরা প্রচারণায় করলেও তেমন একটা ভোটারদের নজরে আসেননি।
ময়মনসিংহ-৩ আসনে পাঁচ জন প্রার্থী। এদের মধ্যে বিএনপির এম ইকবাল হোসেন, বিএনপির আরেকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী আহম্মদ তায়েবুর রহমান হিরন, ১১ দলীয় জোটের বাংলাদেশ নেজামে ইসলামের আবু তাহের নির্বাচনে প্রচারণায় এগিয়ে আছেন। বাকি প্রার্থীদের প্রচারণা তেমন একটা দেখেননি ভোটাররা।
ময়মনসিংহ-৪ আসনে নয় জন প্রার্থী। এর মধ্যে বিএনপির আবু ওয়াহাব আকন্দ, জামায়াতের কামরুল আহসান প্রচার-প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছেন। এই দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলছেন ভোটাররা। বাকি প্রার্থীদের প্রচারণা তেমন দেখতে পাননি তারা। এজন্য তাদের চেনেন না বলে জানিয়েছেন।
ময়মনসিংহ-৫ আসনে পাঁচ জন প্রার্থী। এর মধ্যে বিএনপির জাকির হোসেন বাবলু ও জামায়াতের মতিউর রহমান প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছেন। বাকিদের প্রচারণা তেমন একটা দেখা যায়নি বলছেন ভোটাররা।
ময়মনসিংহ-৬ আসনে পাঁচ জন প্রার্থী। এর মধ্যে বিএনপির আখতার উল আলম, বিদ্রোহী, জামায়াতের কামরুল হাসানের প্রচার-প্রচারণা ভোটাররা দেখতে পেয়েছেন। অন্যরা অপরিচিত থেকে গেছেন।
ময়মনসিংহ-৭ আসনে ছয় জন প্রার্থী। এর মধ্যে বিএনপির মাহবুবুর রহমান, বিএনপির আরেকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ার সাদাত ও জামায়াতের আসাদুজ্জামান সোহেলের প্রচারণা ছিল। বাকিদের চেনেন না ভোটাররা।
ময়মনসিংহ-৮, ৯, ১০ ও ১১ আসনে বিএনপি, বিএনপির বিদ্রোহী ও জামায়াত প্রার্থী প্রচারণায় এগিয়ে আছেন। বাকিদের প্রচারণা তেমন একটা দেখতে পাননি ভোটাররা। এজন্য তাদের চেনেন না বলে জানান।
যশোরের ছয়টি আসনের এক তৃতীয়াংশ প্রার্থী অপরিচিত
যশোরের ছয়টি আসনের এক তৃতীয়াংশ প্রার্থী অপরিচিত মুখ। এসব প্রার্থীর পোস্টার দেখলেও তাদের চেনেন না সংসদীয় আসনের ভোটাররা। অনেকেই জানেন না তাদের আসনে কত জন প্রার্থী। তাদের বেশিরভাগ প্রার্থী এলাকায় প্রচারণা চালাননি। এমনও প্রার্থী আছেন, যাদের দেখেননি বলে জানালেন ভোটাররা।