
নির্বাচনের আগে ভোটার বানানোর অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার কারণে নিউইয়র্কে সামাজিক ও আঞ্চলিক সংগঠনগুলোতে বিভক্তি বাড়াচ্ছে। আর এ কারণে কমিউনিটির কল্যাণে কাজ করা সংগঠনগুলো একের পর এক ভাঙছে। সাংগঠনিক এই বিভক্তি একটা সময় ব্যক্তিগত বিরোধ ও রেষারেষিতে পরিণত হচ্ছে, যা চলছে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর।
‘ভোটার বানানো’র এই প্রক্রিয়া শুধু অস্বচ্ছ নয়, এটাকে অনেকে ‘অসুস্থ’ প্রতিযোগিতাও বলছেন। আর এই ‘অসুস্থ’ প্রতিযোগিতার প্রচলন শুরু হয়েছিল প্রবাসীদের আঞ্চলিক সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটিতে, যা এখনো বিদ্যমান। নির্বাচনের আগে জনপ্রতি ২০ ডলারে ভোটার করা হয়। নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীরা, বিশেষ করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থীরা লাখ লাখ ডলার খরচ করে ১৫-২০ হাজার প্রবাসীকে ভোটার করেন। অনেকে নিজেদের অর্থে ভোটার হন, তাদের সংখ্যা খুবই কম। অন্যের অর্থে ভোটার হওয়ার কারণে প্রবাসীরা এক ধরনের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে পড়েন সংশ্লিষ্ট প্রার্থী বা প্যানেলের কাছে। ফলে ভোটের দিন তারা যোগ্যদের নির্বাচিত করতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। আর এই সুযোগে অনেক অযোগ্য ব্যক্তি নিজেদের তোলা ভোটে বিজয়ী হয়ে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে নেতৃত্ব দিতে আসেন। নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন ইস্যু আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। এসব কারণে নির্বাচন স্থগিত হয়েছে। কিন্তু ‘অসুস্থ’ প্রতিযোগিতা বন্ধ হয়নি। নির্বাচনের আগে ভোটার হওয়ার পদ্ধতি সহজ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্বাচিত হওয়ার পর পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার আশায় পুরনো পদ্ধতি জিইয়ে রাখা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ সোসাইটির একজন সাবেক কর্মকর্তা ঠিকানাকে বলেন, একজন প্রবাসী নির্বাচনের আগে ২০ ডলারের বিনিময়ে দুই বছরের জন্য সোসাইটির সদস্য হন। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো- নির্বাচনের পর তার আর সদস্যপদ থাকে না। গঠনতন্ত্রে কৌশলে কিছু অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া যুক্ত করা হয়েছে। এমনকী প্রতি বছর সাধারণ সভায় যোগ দিতে হলে একজন প্রবাসীকে এক বছরের চাঁদা পরিশোধ করতে হয়। আর এ কারণে বার্ষিক সাধারণ সভায় উপস্থিতি থাকে খুবই কম। ফলে গঠনতন্ত্র সংশোধন বা জনবান্ধব করার সুযোগও কম থাকে। যেসব সংশোধনী প্রস্তাব আসে, সেগুলো বেশিরভাগই প্রার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট।
তিনি বলেন, বর্তমানে অনলাইনের যুগ। একজন প্রবাসী চাইলেই অনলাইনে আবেদন করবেন। ফি পরিশোধ করবেন। কিন্তু বাংলাদেশ সোসাইটি সেই মান্ধাতা আমলে পড়ে রয়েছে। এটা আসলে ইচ্ছাকৃত। তা না হলে একটি সংগঠন ৫০ বছর পার করার পরও কেন সদস্য সংখ্যা ১৮-২০ হাজার হবে? বাংলাদেশিদের বসবাস অনুপাতে বাংলাদেশ সোসাইটির সদস্য কয়েক লাখ হওয়ার কথা। কিন্তু এই প্রক্রিয়া কবে শুরু হবে তা কেউ বলতে পারে না। অনেকটা এসব কারণে বাংলাদেশ সোসাইটি এই কমিউনিটিতে অনেক আঞ্চলিক সংগঠনের চেয়ে পিছিয়ে আছে।
বাংলাদেশ সোসাইটির বর্তমান নেতৃত্বে রয়েছেন যে কমিটি, তারা সেলিম-আলী প্যানেলে নির্বাচন করেছেন। তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে সদস্য হওয়ার আবেদন অনলাইন পদ্ধতি করার কথা ছিল। কিন্তু এই কমিটির দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর হতে চলেছে। কিন্তু অনলাইন পদ্ধতি এখনো চালু হয়নি।
কেন অনলাইনে সদস্য হওয়ার প্রক্রিয়া চালু হয়নি জানতে চাইলে বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী ঠিকানাকে বলেন, এ ব্যাপারে কাজ চলছে। আমাদের টার্মেই এটা সম্পন্ন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
মোহাম্মদ আলী জানান, ব্যাংকিং জটিলতার কারণে, অর্থাৎ অনলাইনে পেমেন্ট নেওয়ার বিষয়টি এখনো সুরাহা হয়নি। এটি সুরাহা হলেই যে কেউ অনলাইন সদস্য হতে পারবেন।
নির্বাচনের পর কেন সদস্যপদ থাকে না? জানতে চাইলে মোহাম্মদ আলী বলেন, ৩০ জুনের আগে যারা সদস্য নবায়ন করেন, শুধুমাত্র তারাই ভোট দিতে পারেন। এই পদ্ধতি অস্বচ্ছ কীনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমনটাই গঠনতন্ত্রে আছে।
একজন প্রবাসী দুই বছরের জন্য সদস্য হন। কিন্তু ৪-৫ মাস পর অনুষ্ঠিত নির্বাচন শেষ হলেই তিনি আর সদস্য থাকেন না। এই অসঙ্গতি দূর করতে গঠনতন্ত্র সংশোধন করতে হবে, উল্লেখ করেন মোহাম্মদ আলী।
প্রবাসের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক সংগঠন জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন এখন বিভক্ত। একসময় যে সংগঠনটি সিলেটবাসীর ঐক্যের প্রতীক ছিল, সেটি এখন নেতৃত্বের কোন্দলে দুই ভাগ হয়েছে। এই সংগঠনেও নির্বাচনের আগে ভোটার বানানো হয়েছিল। সদস্যদের বড় একটি অংশ প্রার্থীদের অর্থে সদস্য হন বলে জোর গলায় ভূমিকা রাখতে পারেন না বলে মনে করেন সাধারণ ভোটাররা। তাদের মতে, আমরা ভোটার হই, সদস্য হই না।
প্রবাসের আরেকটি বড় আঞ্চলিক ও সামাজিক সংগঠন বিয়ানীবাজার সমিতির নির্বাচন স্থগিত হয়েছে আদালতের নির্দেশে, ভোটার তালিকা ইস্যুতে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী একপক্ষের অভিযোগ ভোটার তালিকায় এক ব্যক্তির নাম একাধিক বার উঠেছে। আশ্চর্য্যরে ব্যাপার হলো- যার ডাবল ভোট উঠেছে তিনি নিজে আবেদন করেননি। বরং কোনো প্রার্থীর পক্ষ থেকে এই ভোট উঠানো হয়েছে।
আঞ্চলিক সংগঠন নয়, প্রবাসের অনেক সামাজিক সংগঠনে এই ভোটার করার অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া বিদ্যমান। নিউইয়র্কে একাধিক প্রেসক্লাব রয়েছে। সদ্য অনুষ্ঠিত একটি ক্লাবের নির্বাচনের আগে ভোটার করার অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়েছে। নিউইয়র্কে হাতেগোনা ২০ জন পেশাদার সাংবাদিক নেই। কিন্তু এই প্রেসক্লাবের সদস্য সংখ্যা একশোর বেশী।
শুধু প্রেসক্লাব নয়, একটি লায়ন্স ক্লাবের নির্বাচনের আগে নিজের পকেটের অর্থ খরচ করে অন্যকে ভোটার করা হয়েছে, এমন নজিরও রয়েছে এই কমিউনিটিতে।
এই অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া কবে শেষ হবে তা কেউ জানে না।