
বাংলাদেশ সেমিট্রি নামে বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটি ইউএসএ। মূলত তিন ধাপে এক লাখ কবর তৈরি করা হবে ও বিক্রি করে মালিকের কাছে হস্তান্তর করা হবে এমন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। ইতোমধ্যে কবরের প্রথম কিস্তিতে বিক্রি করা দেয়া ২০ হাজার কবর তৈরি করা হয়েছে। এই কবরগুলোতে এখন যে কবরের মালিকরা মারা গেলে বা তাদের পরিবারের কেউ মারা গেলে তাদেরকে সমাহিত করা সম্ভব হবে। সেই সাথে একটি মরদেহ যাতে সেমিট্রিতেই গোসলসহ কবর দেয়ার জন্য যত আনুষ্ঠানিকতা আছে তা সম্ভব করা হয় সেই জন্য ফিউনারেল হোমেরও কাজ শেষ করা হবে। এতে করে মৃত মানুষেকে সেখানে সমাহিত করা সম্ভব হবে। যাদের নিজের কেনা কবর রয়েছে তাদেরকে সমাহিত করার জন্য ও কবর বাদে অন্যান্য সব আনুষ্ঠিানকিতা করার জন্য জনপ্রতি খরচ হবে ২৫০০ ডলার। আর যাদের কবর কেনা নেই এমন কারো জন্য কবর দেয়ার প্রয়োজন হলে সেখানে আড়াই ডলার ডলারের সাথে খরচ হবে কবরের জন্য আরো এক হাজার ডলার। মোট সাড়ে তিন হাজার ডলার খরচ হবে।
বৃহত্তর নোয়াখালি সোসাইটির উদ্যোগে বাংলাদেশ সেমিট্রির কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। ইতোমধ্যে এই প্রকল্প হাতে নেয়ার পর ২০ হাজার মানুষের কাছে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে কবর বিক্রি করা হয়েছে। সেই কবর হস্তান্তর করা হবে ২০ জুন থেকে। এই জন্য একটি সেমিট্রিতে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। যারা তাদের নিজেদের কবর দেখতে চান এবং যারা আগামীতে দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় কিস্তিতে কবর কিনতে চান তারা কিনতে পারবেন। এই কবরে ১ জুলাই থেকে কেউ মারা থেকে তাকে সমাহিত করা যাবে এই কথাগুলোই জানানো হচ্ছিল ১১ জুন জ্যকসন হাইটসে মুনলাইট রেস্টুরেন্ট অনুষ্ঠিত বৃহত্তর নোয়াখালি সোসাইটির সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠানে। সেখানে বৃহত্তর নোয়াখালি সোসাইটি ইউএসএ এর ট্রাস্ট্রি বোর্ডের নেতৃবৃন্দ এবং সমিতির সভাপতি জাহিদ মিন্টু, সাধারন সম্পাদক এ এস এম মাঈনুদ্দীন পিন্টুসহ সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন নোয়াখালী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রফিকুল ইসলাম মিয়া। বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সভাপতি, নোয়াখালী সমিতির সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ সেমিট্রি প্রকল্পের উদ্যোক্তা ও বাস্তবায়নে ভূমিকা পালনকারী অন্যতম ব্যক্তিত্ব আব্দুর রব মিয়াসহ এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এই প্রকল্প সফল করার পেছনে জাহিদু মিন্টু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এছাড়াও আরো বেশ কয়েকজন নেতারা এই প্রকল্প সফল করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সমিতির সাধারন সম্পদক এ এস এম মাঈনুদ্দীন পিন্টু। মূল বক্তব্য ও লিখিত বক্তব্য রাখেন সভাপতি জাহিদ মিন্টু। সমাপনী বক্তব্য রাখেন রফিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য নিউইয়র্কের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের প্রতি আয়োজক ও সমিতির নেতাদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানানো হয়।
গ্রেটার নোয়াখালী সোসাইটির সভাপতি জাহিদ মিন্টু বলেন, ১১ জুন আজকে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হওয়ার জন্য আপনাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আপনারা জানেন প্রবাসের অন্যতম আঞ্চলিক সংগঠন গ্রেটার নোয়াখালী সোসাইটির উদ্যোগে বাংলাদেশ সেমিট্রি করার লক্ষ্যে নিউইয়র্কের আপ স্টেটে প্রায় এক শত ২৬ একর জমি ক্রয় করা হয়। বৃহত্তর নোয়াখালিবাসীর আন্তরিক ও ঐকান্তিত সহযোগিতায় ২০২৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমরা পুরো নগদ অর্থে বাংলাদেশ সেমিট্রির জন্য জায়গা ক্রয় করি। বাংলাদেশ সেমিট্রিতে প্রায় ১ লাখের অধিক কবর তৈরি করা হবে পর্যায়ক্রমে। প্রবাসে বাঙালিদের সর্ববৃহৎ সেমিট্রির কাজ আমরা গত ৩১ জুলাই ২০২৫ সালে শুরু করি। আপনারা জানেন এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে গিয়ে আমাদের নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। সেই সাথে ছিলো ক্ষুদ্র একটি অংশের অপ-প্রচার। আল্লাহর অশেষ রহমতে এবং আপনাদের সকলের দোয়ায় আমরা সকল বাধা অতিক্রম করেছি।
তিনি বলেন, আমাদের সামনে এলো সেই ঐতিহাসিক ক্ষণ। আগামী ১ জুলাই ২০২৬ সাল থেকে আমরা করব দেয়া শুরু করতে যাচ্ছি। সে জন্যই আজকের সংবাদ সম্মেলন। আপনাদের সাথে নিয়েই এই প্রজেক্ট শুরু করেছিলাম, তাই খুশির খবরটি আপনাদের সাথে শেয়ার করছি। ১ জুলাই কবর দেয়ার কাজ শুরু করার আগে যারা বা যেসব প্রতিষ্ঠান আমাদের কাছ থেকে কবর ক্রয় করেছেন তাদের নিয়ে আরেকটি অনুষ্ঠান স্কটটাউন বাংলাদেশ সেমিট্রিতে আগামী ২০ জুন ২০২৬-এ অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানটি দুপুর ১২টায় শুরু হবে। যারা বা যে সব প্রতিষ্ঠান আমাদের কাছ থেকে কবর ক্রয় করেছেন, বুকিং মানি দেয়ার পর আর কোন অর্থ দেননি, যোগাযোগ রাখছেন না, তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই- আপনাদের বাকি অর্থ অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। তা না হলে চুক্তি অনুযায়ী আপনাদের কবরের জায়গা বুঝিয়ে দেয়া সম্ভব হবে না। অর্থ পরিশোধ না করার কারণে আমরা মার্কিং এর কাজও শুরু করতে পারছি না। আশা করি এ ব্যাপারে আপনারা এগিয়ে আসবেন।
জাহিদ মিন্টু আরো বলেন, আমরা কবর দেয়ার কাজ শুরু করলেও আপাতত ফিউনারেলের কাজ আমরা করছি না। তবে কেউ সহযোগিতা চাইলে আমরা সবধরনের সহযোগিতা করবো। আমরা ফিউনারেল হোমের ব্যাপারে কাজ শুরু করেছি। আশা করি আগামীতে সেই ঘোষণাও আসবে। আপনারা জানেন, প্রথম কিস্তিতে আমরা ২০ হাজার কবর বিক্রির প্রকল্প গ্রহণ করেছিলাম। আজকে ১১ জুন পর্যন্ত আমাদের প্রথম কিস্তির ২০ হাজার কবর বিক্রি সম্পন্ন হয়েছে। আপনাদের অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, প্রতিটি কবর দেয়ার জন্য খরচ পড়বে ২৫০০ ডলার। শিশুদের জন্য ১২০০ ডলার (ইনফেন্ট)। যাদের কবর নেই তাদের ক্ষেত্রে খরচ পড়বে ২৫০০+১০০০= ৩৫০০ ডলার। হেড স্টোনের খরচ পড়বে ১২৫০ ডলার। সব হেড স্টোন একই ধরনের হবে। স্কটটাউন বাংলাদেশ সেমেট্রির ঐখানে জানাজা পড়ার ব্যবস্থা থাকবে অস্থায়ী ভবনে। থাকবে পানির ব্যবস্থা ও ওজু করার ব্যবস্থাও। স্থায়ী ভবনের কাজ অচিরেই শুরু হবে। কবর খোড়া, লাশ নামানোসহ সমস্ত কাজ মেশিনের মাধ্যমে করা হবে। ইতিমধ্যেই সকল যন্ত্রপাতি ও মেশিন ক্রয় করা হয়েছে। মানুষও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আপাতত সোমবার থেকে শনিবার পর্যন্ত সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত লাশ দাফন করা যাবে। রোববার লাশ দাফন করা আলোচনা সাপেক্ষে।
আগামী জুলাই- আগস্ট থেকে দ্বিতীয় কিস্তির কবরের কাজ শুরু। দ্বিতীয় কিস্তিতে কবরের সংখ্যা হবে প্রায় ৪২ হাজার। বৃহত্তর নোয়াখালি সোসাইটির কর্মকর্তা, ট্রাস্টি এবং উপদেষ্টারদের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে দ্বিতীয় কিস্তির কবরের মূল্য নির্ধারণ করা হবে।
সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে জাহিদ মিন্টু বলেন, প্রতিটি ভাল কাজের সাথে আমরা আপনাদের পেয়েছি। আশা করি সব সময় পাবো। আপনাদের লেখনি, বুদ্ধি এবং পরামর্শই আমাদের শক্তি এবং প্রেরণা। এই কাজে যারা আমাদের সহযোগিতা করেছেন, অর্থ দিয়েছেন তাদের প্রতি আমাদের আফুরান কৃতজ্ঞতা। সেই সাথে ধন্যবাদ জানাচ্ছি বৃহত্তর নোয়াখালি সোসাইটির উপদেষ্টা পরিষদ, ট্রাস্টি বোর্ড এবং কার্যকরি পরিষদের সদস্যদের। সেই সাথে বৃহত্তর নোয়াখালিবাসীসহ প্রবাসী বাংলাদেশী কম্যুনিটিকে। ধন্যবাদ সংবাদিক বন্ধুদের আমাদের আমন্ত্রণে সাড়া দেয়ার জন্য।
তৃতীয় কিস্তির কাজ কবে নাগাদ শুরু হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তৃতীয় প্রকল্পের কাজ কবে শুরু হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। এটি দ্বিতীয় কিস্তি চলাকালীন সময়ে ঠিক করা হবে। মোট এক লাখ কবর হবে। শেষ কিস্তিতে প্রায় ৩০ হাজার কবর দেয়া হবে।
২০ হাজার কবরের মধ্যে কত কবরের অর্থ এখনও তারা হাতে পাননি এই বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, কিছু কবরের অর্থ আমরা পাইনি। তারা যোগাযোগও করেননি। আমরা তাদেরকে অর্থ পরিশোধ করার জন্য বলবো। যারা কোন ধরণের যোগাযোগ করছেন না তাদেরকে অর্থ পরিশোধ করার জন্য সময় দেয়া হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে না অর্থ পরিশোধ করে কবর বুঝে না নিলে তারা আর নিতে ইচ্ছুক নন বলেই বিবেচিত হবে। যারা অর্থ বকেয়া রেখেছেন ও যোগাযোগ রাখছেন না তারা অর্থ না দিলে তাদের কবরগলো কি সংগঠন বা ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ব্যক্তর কাছে বিক্রির সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।
এক লাখ কবরের ১০ থেকে ২০ হাজার একক ব্যক্তি বা পরিবারের কাছে বিক্রির জন্য সুযোগ তৈরি করা যেত কিনা এই ব্যাপারে তিনি বলেন, এখনই এই বিষয়ে বলা যাচ্ছে না। এটি আলোচনায় আসতে পারে।