
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) পৃথক ঘটনায় এক শিক্ষকসহ তিনজনকে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তাদের মধ্যে এক শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত, এক শিক্ষার্থীকে স্থায়ীভাবে এবং আরেক শিক্ষার্থীকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। অন্যদিকে, সহকারী প্রক্টরের গায়ে হাত তোলার ঘটনায় স্থায়ী বহিষ্কার ও সনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত পাওয়া এক শিক্ষার্থীর বহিষ্কারাদেশ স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট।
সোমবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. সফিকুল ইসলাম এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, গত ৩ জুলাই প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে একটি বিতর্কিত পোস্ট দেন। ১১ জুলাই পোস্টটির স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর পরদিন উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-আমীনকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৬৮তম সিন্ডিকেট সভায় আবদুল ওয়াহেদকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি অধিকতর তদন্তের জন্য নতুন করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. হাছান মিয়া বলেন, প্রথম তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শিক্ষক আবদুল ওয়াহেদকে অভিযোগনামা দেওয়া হবে। এরপর তাকে নিজের বক্তব্য ও অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। দ্বিতীয় তদন্ত কমিটি বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেবে। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে সাময়িক বরখাস্তের বিষয়ে এখনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো লিখিত চিঠি পাননি বলে জানিয়েছেন আবদুল ওয়াহেদ। তিনি বলেন, আমি এখনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো চিঠিপত্র পাইনি। গত শুক্রবার সিন্ডিকেটের সভা হয়েছে এবং সেখানে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা শুনেছি। কিন্তু অফিশিয়ালি এখনো কিছু জানানো হয়নি। আমার বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ এবং কেন বহিষ্কার করা হয়েছে, সে বিষয়ে অফিসিয়াল চিঠি না পাওয়া পর্যন্ত আমি মন্তব্য করতে পারছি না।
তিনি আরও বলেন, শাস্তির সঙ্গে অপরাধের একটা সম্পর্ক থাকতে হয়। আমি সেই সম্পর্কটা খুঁজতে গিয়ে কখনো হাসছি, কখনো মন খারাপ করছি। কিন্তু এখনো সন্তোষজনকভাবে বুঝতে পারছি না—কেন আমাকে এভাবে শাস্তি দেওয়া হলো।
সংঘর্ষে দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কার
গত ৯ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদ এলাকায় দর্শন ও ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দুই শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। দর্শন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. ওয়াসিমকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। আর ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী তাহসির হাসানকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। গত শুক্রবার অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৬৮তম সিন্ডিকেট সভায় তাদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়।
ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার হাছান মিয়া বলেন, হাতাহাতির ঘটনায় একজন শিক্ষার্থীকে স্থায়ী এবং আরেকজনকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ বিষয়ে শৃঙ্খলা কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কমিটির কার্যবিবরণী প্রকাশ হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
আফসানার বহিষ্কারাদেশ স্থগিত
গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী বিজয়-২৪ হলের (সাবেক জননেত্রী শেখ হাসিনা হল) নামফলক ও কংক্রিটের তৈরি নৌকা ভাঙতে গেলে হলের কয়েকজন ছাত্রী তাদের বাধা দেন। এ সময় সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক মো. কোরবান আলীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় আইন বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী আফসানা এনায়েতকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়। পাশাপাশি তার সনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হন আফসানা। আদালতে তিনি নিজের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। পরে আদালত তাকে ছয় মাসের বহিষ্কারাদেশ দেন। তবে মামলার শুনানি ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই ছয় মাসের মেয়াদ পার হয়ে গেছে।
ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. হাছান মিয়া বলেন, আফসানা এনায়েত আদালতের শরণাপন্ন হয়ে আইনি সুরক্ষা পেয়েছেন। আদালতের আদেশ অনুযায়ী তার বহিষ্কারাদেশের বিষয়টি কার্যকর হবে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে পারবেন কি না, সেটিও আদালতের আদেশের ওপর নির্ভর করবে।
গবেষণা ও একাডেমিক কাজ নিয়ে উদ্বেগ
সাময়িক বরখাস্তের কারণে তার একাডেমিক ও গবেষণার দায়িত্ব নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছেন আবদুল ওয়াহেদ। তিনি বলেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। এ ছাড়া তার অধীনে মাস্টার্স ও এমফিলের শিক্ষার্থীরা গবেষণা করছেন এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পের সঙ্গে তিনি যুক্ত।
ওয়াহেদ চৌধুরী বলেন, এসব দায়িত্ব হস্তান্তরের বিষয় আছে। কিন্তু চেয়ারম্যানও জানেন না, কী করবেন। এ জন্য একটি চিঠি দেওয়া খুব জরুরি। আমি রেজিস্ট্রার মহোদয়কে ফোন করে অন্তত জানতে চেয়েছি, সিদ্ধান্তটি কোন তারিখ থেকে কার্যকর হবে।
তিনি জানান, জার্মানির ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম, বার্লিন এবং স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ার একটি মলিকিউলার ল্যাবের সঙ্গে তার গবেষণা সহযোগিতা রয়েছে। এ ছাড়া দেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা প্রকল্পের সঙ্গেও তিনি যুক্ত। তার ওয়ার্কিং গ্রুপে বিভিন্ন বর্ষের প্রায় ১৮ জন শিক্ষার্থী গবেষণায় যুক্ত রয়েছেন।
তিনি বলেন, আমি সারাজীবন বিজ্ঞানী হতে চেয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার মূল লক্ষ্যই ছিল বিজ্ঞানী হওয়া। আমি বিজ্ঞানী হতে চেয়েছি এবং এখনো সেটাই আমার স্বপ্ন।
অধিকতর তদন্তের জন্য নতুন কমিটি গঠন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ওয়াহেদ। তিনি বলেন, আগের তদন্ত যদি উপাচার্য পর্যায়ের কমিটি করে থাকে, তাহলে পরবর্তী তদন্ত আরও নিরপেক্ষ কাঠামোর মাধ্যমে হওয়া উচিত। সেটি আন্তবিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যদের কমিটি, ইউজিসির কমিটি কিংবা বাইরের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত হতে পারে বলে মনে করি।