
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও উত্তেজনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত কোটি প্রবাসীর মধ্যে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিকের জীবন-জীবিকা এবং দেশের অর্থনীতির ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর আশঙ্কা। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু প্রবাসীদের নিরাপত্তাই নয়, বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং শ্রমবাজারও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সরকারি ও বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি প্রবাসী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী রয়েছেন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান এবং বাহরাইনে।
শুধু সৌদি আরবেই প্রায় ৩৫ লাখ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি কাজ করছেন। এ ছাড়া কাতার, কুয়েত ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রমিক কর্মরত আছেন। বাংলাদেশের মোট বিদেশগামী শ্রমিকের প্রায় ৬৭ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত, ফলে এই অঞ্চলের যে কোনো অস্থিরতা বাংলাদেশের শ্রমবাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে প্রবাসীদের কাজ, বাসস্থান এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে যুদ্ধের কারণে অনেক দেশে আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ফ্লাইটও স্থগিত করা হয়েছে। এতে ভ্রমণ এবং কর্মসংস্থান সংক্রান্ত কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে। কিছু এলাকায় হামলার ঘটনায় বিদেশি শ্রমিকদের হতাহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে, যা প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ইতিমধ্যে ইরানের হামলায় বাহরাইনে একজন এবং কুয়েতে দুইজন প্রবাসী বাংলাদেশি মারা গেছেন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৯ জন বাংলাদেশি।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য প্রবাসী আয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রবাসী আয় প্রায় ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যার বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্যপ্রাচ্যের নির্মাণ, তেল ও পরিষেবা খাতে নিয়োগ কমতে পারে। এর ফলে লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন এবং এতে রেমিট্যান্স প্রবাহেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, স্বল্পমেয়াদে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম হলেও সংঘাত দীর্ঘ হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। পরিস্থিতি বিবেচনায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো প্রবাসীদের জন্য সতর্কতা জারি করেছে। অনেক দেশে হটলাইন চালু করা হয়েছে এবং প্রবাসীদের নিরাপদ স্থানে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি সূত্র জানায়, প্রয়োজনে জরুরি পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের সহায়তা, উদ্ধার বা দেশে ফিরিয়ে আনার জন্যও প্রস্তুতি রাখা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। তারা শ্রমবাজার বৈচিত্র্যকরণ, নতুন গন্তব্য দেশে শ্রমিক পাঠানো এবং অর্থনীতিকে রেমিট্যান্স নির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যদি আরও জটিল আকার ধারণ করে, তাহলে এর প্রভাব শুধু প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনেই নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও গভীরভাবে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।