প্রবাসী আয়ের উৎসে উত্থান-পতন সমাচার

ডেস্ক রিপোর্ট
  ০৫ মে ২০২৬, ১৪:১৭

সঙ্কটে থাকা দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরানো রেমিটেন্সের সুবাতাসের মধ্যে ওলটপালট হয়েছে উৎসে। আগের অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স এসেছিল যে দেশ থেকে সেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী আয়ে ধস নেমেছে চলতি অর্থবছরের ১০ মাস না যেতেই। আর তালিকার চতুর্থ স্থানে থাকা যুক্তরাজ্য থেকে বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
দেশের রেমিটেন্স আসার অন্যতম প্রধান উৎস পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর তালিকাতেও অবস্থান বদল হয়েছে। দুই নম্বর স্থানে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাতকে টপকে শীর্ষে উঠে এসেছে আগের অর্থবছরে তালিকার তৃতীয় স্থানে থাকা সৌদি আরব। একই সঙ্গে দেশটি পেছনে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্রকেও; যেটি নেমে গেছে তালিকার পঞ্চম স্থানে।
অপরদিকে যুক্তরাজ্য থেকে বেশি আসতে শুরু করেছে রেমিটেন্স; এতে আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রকে ডিঙিয়ে দ্বিতীয় স্থানে চলে এসেছে দেশটি। আর শীর্ষ পাঁচের তালিকায় মালয়েশিয়া উঠে এসেছে চতুর্থ স্থানে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল সময়ে টানা বাড়তে থাকা রেমিটেন্সের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে এ চিত্র। তবে আগের দুই অর্থবছরের পুরো সময়ে বেশি রেমিটেন্স পাঠানো শীর্ষ পাঁচে কোনো বদল হয়নি।
এ বিষয়ে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক সভাপতি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “গত দুই অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র ও আরব আমিরাত থেকে প্রবাসী আয় বেড়ে যাওয়া মানে দেশগুলো থেকে প্রকৃত প্রবাসী আয় বেড়েছে, হয়ত তেমন নয়। অন্যান্য দেশের আয়ও প্রবাসী আয় প্রেরণকারী বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর হাত ঘুরে যুক্তরাষ্ট্র বা আমিরাত থেকে এসেছে। সে কারণে পরিসংখ্যানে ওই দুই দেশ থেকে প্রবাসী আয়ে বড় প্রবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল।
“কিন্তু এবার যুক্তরাজ্য থেকে বাড়ার কারণ বুঝতে পারছি না।”
আগের দিন এপ্রিলের রেমিটেন্স আসার তথ্য প্রকাশের পরদিন সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক রেমিটেন্স প্রবাহের দেশভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করেছে।
এতে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল ১০ মাসে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় আসে এমন ১০টি উৎস দেশের মধ্যে নয়টি থেকে আয় বেড়েছে; কমেছে কেবল যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
এসময়ে বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসীরা মোট ২৯৩৩ কোটি ২০ লাখ (২৯.৩২ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেশি।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৭৩ কোটি ৫৬ লাখ ডলার এসেছে সৌদি আরব থেকে, যা এই ১০ মাসের মোট রেমিটেন্সের ১৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। গত অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিলের চেয়ে বেশি এসেছে ৪৫ দশমিক ১৮ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে দেশটি থেকে এসেছিল ৩২৬ কোটি ১৯ লাখ ডলার।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিটেন্স এসেছে যুক্তরাজ্য থেকে ৪০৩ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে বেশি এসেছে ৬৪ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। গত জুলাই-এপ্রিলে এসেছিল ২৪৫ কোটি ৯৬ লাখ ডলার।
আরব আমিরাত থেকে এসেছে ৩৮১ কোটি ৫ লাখ ডলার; বেড়েছে ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৩৬১ কোটি ১৪ লাখ ডলার।
মালয়েশিয়া থেকে এসেছে ২৯২ কোটি ২৭ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিলে এসেছিল ২১০ কোটি ৫৫ লাখ ডলার; বেড়েছে ৩৮ দশমিক ৮১ শতাংশ।
অপরদিকে গত অর্থবছরের শীর্ষস্থান থেকে এবারের ১০ মাসের হিসেবে পাঁচে নেমে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে ২৫২ কোটি ২১ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৪২৭ কোটি ৯ লাখ ডলার; কমেছে ৪২ শতাংশ।
অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন (তিন হাজার ৩৩ কোটি) ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা; যা ছিল আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স এসেছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে। দেশটি সেবার টপকে যায় সংযুক্ত আরব আমিরাতকে।
তবে এবার হিসাব আরেকটু ওলটপালট হয়েছে। উভয় দেশই শীর্ষ দুই স্থান হারিয়েছে; এক ধাক্কায় যুক্তরাষ্ট্র নেমেছে পঞ্চম স্থানে আর আমিরাত তৃতীয় স্থানে। আর আগের দুই অর্থবছরে তৃতীয় স্থানে তাকা সৌদি আরব থেকে এখন বেশি রেমিটেন্স আসছে। দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে যুক্তরাজ্য এবং এক ধাপ উন্নতি হয়ে মালয়েশিয়া রয়েছে পঞ্চম স্থানে।
রেমিটেন্সের উৎসে এমন উত্থান-পতনের পেছনে কী কাজ করছে, সেটির সুনির্দিষ্ট কারণ বলতে পারছেন না ব্যাংকারসহ সংশ্লিষ্টরা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, এক্সচেঞ্জ হাউজের মাধ্যমে রেমিটেন্স পাঠানোর পদ্ধতিগত হিসাবের কারণে এমনটি হয়ে থাকতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক যা পরে নির্দেশনা দিয়ে পরিবর্তন করেছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এর প্রকৃত কারণ বাংলাদেশ ব্যাংককে ভালোভাবে খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন।
“এক্ষেত্রে অন্য কোনো কারণ আছে কিনা, পাচার হওয়া টাকা রেমিটেন্স হয়ে দেশে আসছে কিনা, সবকিছু ভালোভাবে খতিয়ে দেখতে হবে,” যোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, “রেমিটেন্সের উৎস দেশের ওঠানামা নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। গত কয়েক বছর ধরে এক দেশ হঠাৎ করে শীর্ষে চলে আসছে, পরের বছর আবার নিচে নেমে যাচ্ছে। এটা কেন হচ্ছে–বুঝতে পারছি না।
“সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী থাকেন। সেখান থেকে এবার বেশি রেমিটেন্স আসছে–এটা না হয় মেনে নিলাম। কিন্তু যুক্তরাজ্য থেকে হঠাৎ বাড়ল কেন? তার কোনো সদুত্তর কিন্তু পাচ্ছি না। সে কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অনুরোধ করবো–রেমিটেন্সের উৎস দেশে ভালোভাবে খোঁজখবর নিয়ে প্রকৃত কারণ বের করতে।”
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, “দেখতে হবে–কেন এমনটা হচ্ছে। যদি অন্য কোনো কারণ থাকে তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবস্থা নেবে।”

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে উপসাগরীয় ছয় দেশের মধ্যে সৌদি আরবে প্রায় ২০ লাখ, আরব আমিরাতে ১০ লাখ, ওমানে ৭ লাখ, কাতারে ৪ লাখ ৫০ হাজার, বাহরাইনে ১ লাখ ৫০ হাজার ও কুয়েতে ১ লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী আছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে ৮ লাখের মত এবং যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত প্রবাসীর সংখ্যা ১০ লাখের মত। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশির সংখ্যা ৫ লাখের বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, “এখন থেকে ব্যাংকগুলোকে যে দেশের রেমিটেন্স, সেই দেশের আয় হিসাবে দেখানোর নির্দেশনা যথাযথভাবে মেনে চলতে বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যে কারণে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে।
“মাস্টারকার্ড, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নসহ যুক্তরাষ্ট্রের রেমিটেন্স হাউজগুলো পশ্চিম এশিয়াসহ অন্যান্য দেশ থেকে প্রবাসী আয় সংগ্রহ করে দেশটিতে নিয়ে যেত। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের গেটওয়ে ব্যবহার করে বাংলাদেশে পাঠাত। এই কারণে মধ্যপ্রাচ্যের রেমিটেন্সও যুক্তরাষ্ট্রের বলে বিবেচিত হত।”
২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে এ প্রক্রিয়ায় সংশোধন আনার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, এ কারণে প্রবাসী আয়ের উৎস দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তালিকার নিচের দিকে নেমে গেছে।

প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে সরাসরি ব্যাংক কিংবা এক্সচেঞ্জ হাউজের মাধ্যমে দেশে আসে। এক্সচেঞ্জ হাউজের সংগ্রহ করা রেমিটেন্স ব্যাংকগুলো কিনে নিয়ে সুবিধাভোগীকে টাকা পরিশোধ করে। দেশের মোট রেমিটেন্সের বেশি অংশ আসে এক্সচেঞ্জ হাউজের মাধ্যমে।
যেসব দেশের এক্সচেঞ্জ হাউজের মাধ্যমে বাংলাদেশে রেমিটেন্স বেশি আসে সেগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও আরব আমিরাতে নিবন্ধিত কোম্পানি বেশি। ফলে প্রবাসীরা কোন দেশ থেকে অর্থ পাঠাচ্ছেন, তা না দেখিয়ে এক্সচেঞ্জ হাউসের নিবন্ধিত দেশ থেকে দেখানো হচ্ছিল। যে কারণে সৌদি আরব থেকে পাঠানো অর্থও যুক্তরাষ্ট্র ও আমিরাতের নামে আসত।
এই কর্মকর্তা বলেন, “কিন্তু এই যুক্তিও পুরোপুরি মানা যাচ্ছে না। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্য থেকে রেমিটেন্স বাড়ার কোনো কারণ দেখছি না।”
সূত্র : বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম