
ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে শান্তি প্রক্রিয়ায় লেবানন ও হিজবুল্লাহর ভূমিকা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান তার আঞ্চলিক মিত্রদের বাদ দিয়ে কোনও সমঝোতায় যেতে রাজি নয়। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। খবর আল জাজিরার।
এমন প্রেক্ষাপটে সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নেগার মোরতাজাভি পরিস্থিতির রাজনৈতিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন। মোরতাজাভি বলেন, ইরান এমন একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক শান্তিচুক্তি চায়, যেখানে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই ক্ষেত্রে তেহরান ‘যুদ্ধে একসঙ্গে, শান্তিতেও একসঙ্গে’—এই নীতিতে অটল রয়েছে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে লেবানন ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয় বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র চায় শান্তি প্রক্রিয়াকে লেবানন ইস্যু থেকে আলাদা রাখতে। মোরতাজাভি বলেন, বৈরুতে ইসরায়েলি হামলার জবাবে উত্তর ইসরায়েলে ইরানের হামলা ছিল ওই ‘লাল রেখা’ কার্যকর করার একটি প্রচেষ্টা।
তিনি বলেন, ‘ইরান নিশ্চিত করতে চায় যে লেবানন ইস্যু শান্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্তই থাকবে। আবারও বলছি, যুদ্ধ ও শান্তিতেও একসঙ্গে। এই হামলার মাধ্যমে ইরান দেখাতে চেয়েছে যে তারা শুধু হুমকি দেয় না; প্রয়োজন হলে ঝুঁকি নিতে এবং উত্তেজনার মাত্রা আরও বাড়াতেও প্রস্তুত।’
এদিকে ইসরায়েলের পাল্টা হামলা ট্রাম্পের সেই দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, যেখানে তিনি নিজেকে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রক হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। মোরতাজাভি বলেন, ‘মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গণমাধ্যমকে যা বলেছেন, ইসরায়েল মূলত তারই অবাধ্যতা দেখাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত বিষয়টি সেই বৃহত্তর চিত্রের দিকেই যায়। ইরান চায় তাদের মিত্র হিজবুল্লাহ ও লেবানন এই শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হোক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তা স্বীকৃতি দিতে অনিচ্ছুক। একই সঙ্গে শান্তির পথে অগ্রসর হতে ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণেও তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।’
এর মধ্যেই নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে দেশটির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। হামলা প্রতিহত করতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়েছে।
ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ জানিয়েছে, জেরুজালেম ও মধ্য ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। জেরিকো এলাকার কাছে আকাশে প্রতিহত করা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। দক্ষিণ ইসরায়েলেও সতর্কতামূলক সাইরেন বেজেছে।
তবে ইসরায়েলের জরুরি চিকিৎসাসেবা সংস্থা মাগেন ডেভিড অ্যাডম জানিয়েছে, সর্বশেষ ইরানি হামলায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনও হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, কোনও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মেনে নেবে না। তার দাবি, ইসরায়েলের হামলা মূলত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো হচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে ইসরায়েল কার্যত ট্রাম্পকে বিব্রত করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ট্রাম্প যখন ইসরায়েলকে পাল্টা হামলা না চালানোর আহ্বান জানান, তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হামলা হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। তার ভাষায়, এতে ট্রাম্পের ‘অপমান আরও বেড়েছে’ এবং তিনি যুদ্ধ পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, ইসফাহান প্রদেশের নাজাফাবাদে ইসরায়েলি হামলায় কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। একই সঙ্গে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের উদ্ধার ও চিকিৎসা দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কা আবারও জোরালো হয়েছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। ইসরায়েলের হামলার পর বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক ঘণ্টার মধ্যে ৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৬ দশমিক ৭৫ ডলারে পৌঁছেছে।