
রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি কিংবা রাষ্ট্রকে ‘জিম্মি’ করে কোনো দাবি আদায় করা যাবে না বলে সতর্ক করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ। বুধবার (৭ অক্টোবর) ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশল কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
রানা সানাউল্লাহ বলেন, সরকার আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তবে আলোচনাকে রাজনৈতিক দাবি আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানে দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফকে (পিটিআই) অস্থিতিশীলতার রাজনীতি থেকে সরে এসে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রকে জিম্মি করে কিংবা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পথে গিয়ে কোনো দাবি মেনে নেওয়া হবে না।’
পিটিআইয়ের উদ্দেশে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত রাজনৈতিক এজেন্ডাকে জাতীয় স্বার্থের ওপর প্রাধান্য না দিয়ে আলোচনায় বসে মতপার্থক্য নিরসন করা উচিত। তবে সরকার আলোচনায় আগ্রহী হলেও চাপ প্রয়োগ করে দাবি আদায়ের কোনো কৌশল মেনে নেবে না বলেও স্পষ্ট করেন তিনি।
রানা সানাউল্লাহ অভিযোগ করেন, ২০১১ সালের পর থেকে পিটিআই পাকিস্তানের রাজনীতিতে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা, অস্থিতিশীলতা ও আক্রমণাত্মক বক্তব্যের সংস্কৃতি তৈরি করেছে। তার দাবি, এর ফলে রাজনৈতিক সহনশীলতার জায়গা দখল করেছে পরস্পরের বিরুদ্ধে কটূক্তি ও ব্যক্তিগত আক্রমণের প্রবণতা।
তিনি বলেন, ২০১৪ সালে ইসলামাবাদে পিটিআইয়ের দীর্ঘ অবস্থান কর্মসূচির পর থেকেই রাজধানী ঘেরাও দলটির রাজনৈতিক কৌশলের অন্যতম অংশ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক আন্দোলনেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রানা সানাউল্লাহ আরও অভিযোগ করেন, খাইবার পাখতুনখোয়া প্রাদেশিক সরকার তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য সরকারি সম্পদ ব্যবহার করছে। সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে নিহত পুলিশ, বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, নিহতদের বড় একটি অংশই খাইবার পাখতুনখোয়ার বাসিন্দা।
তার ভাষ্য, একদিকে নিহতদের মরদেহ পড়ে ছিল, অন্যদিকে প্রাদেশিক সরকারের লোকজন ঢোল বাজিয়ে ও স্লোগান দিয়ে মানুষকে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছিল। এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সন্ত্রাসবিরোধী নীতি নিয়ে সরকারের অবস্থান
সন্ত্রাসবিরোধী নীতি নিয়ে পিটিআইয়ের বক্তব্যকে ‘বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা’ বলে মন্তব্য করেছেন রানা সানাউল্লাহ। তিনি বলেন, সন্ত্রাস দমনের নীতি ইতোমধ্যে নির্ধারিত হয়েছে এবং সেটি বাস্তবায়নও চলছে।
খাইবার পাখতুনখোয়ায় চলমান গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান নিয়েই মূল বিরোধ তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি। তার দাবি, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জীবন বাজি রেখে এসব অভিযান চালাচ্ছেন এবং এতে সাফল্যও আসছে। পিটিআই এসব অভিযানের বিরোধিতা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
রানা সানাউল্লাহ বলেন, নতুন কোনো বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে সাধারণ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করার পরিকল্পনা সরকারের নেই। চলমান গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযানই বর্তমান নীতির অধীনে অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী নীতি গত ৪০ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে তৈরি হয়েছে। আফগানিস্তান, তালেবান, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান ও তেহরিক-ই-তালেবান আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা এতে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
আফগানিস্তান নিয়েও কঠোর বার্তা
আফগানিস্তান প্রসঙ্গে রানা সানাউল্লাহ বলেন, পাকিস্তানের দাবি খুবই স্পষ্ট—আফগান ভূখণ্ড যেন পাকিস্তানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ব্যবহার না হয়।
তার দাবি, সৌদি আরব, কাতার, চীন ও তুরস্কসহ কয়েকটি বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ আফগান সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছে। তবে আফগান সরকার এখনো পাকিস্তানকে প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা দেয়নি।
রানা সানাউল্লাহ বলেন, আফগান ভূখণ্ডে এমন প্রশিক্ষণ শিবির বা কর্মকাণ্ড পরিচালিত হলে, যা পরবর্তীতে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলার কারণ হতে পারে, সেগুলো নিষ্ক্রিয় করার অধিকার পাকিস্তানের রয়েছে।
তিনি বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী নীতির বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে ঐকমত্য রয়েছে। পিটিআই যদি এর বিরোধিতা করে থাকে, সেটি জাতীয় স্বার্থের চেয়ে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণেই করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘ইমরান খানই সিদ্ধান্ত নেবেন’
এদিকে পিটিআইয়ের খাইবার পাখতুনখোয়া শাখার মুখপাত্র শওকত ইউসুফজাই জানিয়েছেন, চাপ প্রয়োগ করে তাদের দীর্ঘ পদযাত্রা বন্ধ করা যাবে না। কারাবন্দি দলীয় প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানই কেবল এই কর্মসূচি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন বলে জানান তিনি।
পিটিআইয়ের নেতৃত্বে খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির নেতৃত্বে চলমান এই পদযাত্রার রুটও পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, কর্মসূচিটি প্রথমে খাইবারের দিকে যাবে এবং পরে পেশোয়ারের দিকে অগ্রসর হবে।
শওকত ইউসুফজাই প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের আলোচনার আহ্বান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, শুধু গণমাধ্যমে আলোচনার কথা না বলে সরকারকে বিরোধীদের দাবিগুলো নিয়ে বাস্তব আলোচনায় বসতে হবে।
তিনি বলেন, ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ এবং তাকে হাসপাতালে স্থানান্তরের দাবিতে পিটিআই পিছু হটবে না। কারাগারে থাকা নারীদের, বিশেষ করে ইমরান খানের বোনদের মুক্তির দাবিও জানান তিনি।
খাইবার পাখতুনখোয়ার গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দি প্রাদেশিক মুখ্য সচিব ও পুলিশের মহাপরিদর্শককে বৈঠকে ডাকায়ও আপত্তি জানান ইউসুফজাই। তার দাবি, ১৮তম সংশোধনীর পর গভর্নরের এ ধরনের ক্ষমতা নেই।
দীর্ঘ পদযাত্রা ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার
এদিকে দীর্ঘ পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে পেশোয়ার থেকে নওশেরা পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি করেছে খাইবার পাখতুনখোয়া পুলিশ। নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে ড্রোন ক্যামেরা ব্যবহারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের মুখপাত্র আলম খান জানান, নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। শহর, শহরতলি ও রিং রোড এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন তিনজন পুলিশ সুপার। পদযাত্রার পথ ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ৩০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে। পাশাপাশি পেশোয়ারের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোতেও সিটি পেট্রোল ফোর্স মোতায়েন থাকবে।
সূত্র: এক্সপ্রেস ট্রিবিউন