
বুধবার জাতীয় সংসদে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল পাস হয়েছে। এর ফলে আওয়ামী লীগ এবং তার সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞার মেয়াদও অনির্দিষ্টকালের জন্য বেড়ে গেল। একই সঙ্গে, বিলটির ওপর সংসদে আলোচনার সুযোগ না দেওয়ায় আইনটি কিছু প্রশ্নেরও জন্ম দিল।
২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮ এবং ২০ ধারা সংশোধন করে অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর আওয়ামী লীগ এবং দলটির সব সহযোগী ও অঙ্গ সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। একই আইনে ২০২৪ সালের অক্টোবরে নিষিদ্ধ হয় দলটির ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ সংগঠন ছাত্রলীগও।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা আদেশ ও অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাইয়ে বর্তমান সংসদে গঠিত বিশেষ কমিটির পরামর্শ ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের অন্য ১৪টির সঙ্গে আলোচ্য অধ্যাদেশটিও সংশোধিত আকারে পাস হোক। কিন্তু পর্যবেক্ষকদের কিছুটা বিস্মিত করে সংশোধনী ছাড়াই তা পাস হয়েছে। নিয়ম অনুসারে, ১২ এপ্রিলের মধ্যে পাস না হলে অধ্যাদেশটি স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করত। সম্ভবত এ ধারণা থেকেই অধ্যাদেশটি হুবহু বিল আকারে সংসদে তোলা হয়। তাড়াহুড়ার কারণও হয়তো এখানে নিহিত।
প্রশ্ন উঠেছে, অধ্যাদেশের মতো আইনেও যে বলা আছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ সত্তা দ্বারা বা উহার পক্ষে বা সমর্থনে প্রেস বিবৃতির প্রকাশনা বা মুদ্রণ কিংবা গণমাধ্যম, অনলাইন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্য যে কোনো মাধ্যমে যে কোনো ধরনের প্রচারণা, অথবা মিছিল, সভা-সমাবেশ বা সংবাদ সম্মেলন আয়োজন বা জনসমক্ষে বক্তৃতা প্রদান নিষিদ্ধ করা হবে; তার শাস্তি কী হবে? আদালতই বা এহেন ‘অপরাধ’-এর বিচার করবেন কীভাবে? নাকি অন্তর্বর্তী সরকার যেমন বিনা বিচারে কয়েক হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী-সমর্থককে এ বিষয়ে সংবিধান ও আইনের বিধান অমান্য করে মাসের পর মাস জেলে পুরে রেখেছে; এ ক্ষেত্রেও তা-ই হবে?
তাহলে আইনের শাসনের কী হবে? আজকের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ১৭ বছর পর দেশে ফিরে গণসংবর্ধনা, একাধিক সংবাদ সম্মেলন এবং নির্বাচনী ইশতেহারে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছিলেন।
মনে আছে, গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯ আগস্ট, মানবাধিকার সংগঠন সারডা ‘ছাত্র-জনতাকে হত্যার দায়ে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ও দল হিসেবে তাদের নিবন্ধন বাতিল চেয়ে’ উচ্চ আদালতে রিট করেছিল। তখনকার অ্যাটর্নি জেনারেল এবং আজকের আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান আদালতে স্পষ্ট ভাষায় ওই রিট খারিজ চেয়ে বলেছিলেন, ‘সংবিধানে রাজনৈতিক দল পরিচালনার যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা খর্ব করবে না সরকার। বিগত কর্তৃত্ববাদী সরকারের অনেক অন্যায়-অবিচারের শিকার হয়েছে মানুষ। সেগুলোর বিচারের জন্য আইন ও আদালত রয়েছে। তবে … এ জন্য দল নিষিদ্ধ করার সুযোগ নেই’ (বাংলা ট্রিবিউন, ২৭ আগস্ট ২০২৪)।
সেই সময় আইন উপদেষ্টাও সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ যা করেছে, সেটা তাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে যায় না। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘এই কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যক্তিগত দায় থাকতে পারে, নেতাদের সামষ্টিক দায় থাকতে পারে, কিন্তু দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা সমীচীন হবে বলে আমি মনে করি না’ (বিডিনিউজ, ২৮ আগস্ট ২০২৪)।
বিএনপির মহাসচিবসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতাও তখন নির্বাহী আদেশে কোনো দল নিষিদ্ধের বিরোধিতা করে আওয়ামী লীগের বিষয়টি জনগণের কাছে ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন।
সত্য, বিশেষত জামায়াতে ইসলামী ও জোটসঙ্গী এনসিপির আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গত বছরের ১১ মে আলোচ্য অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে। তখন বিএনপি নেতারাও এতে ‘সন্তোষ’ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু মধ্যবর্তী ৯ মাসে কী এমন ঘটনা ঘটল যে, বিএনপিকে আওযামী লীগ নিষিদ্ধের প্রশ্নে একেবারে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যেতে হলো?
এটাও সত্য, গত বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের পর বিএনপি নেতারা দাবি করেছিলেন, বিচারিক প্রক্রিয়ায় দলটিকে নিষিদ্ধ করার জন্য তারা একাধিকবার অন্তর্বর্তী সরকারকে বলেছিলেন। কিন্তু গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিভিন্ন এলাকায় ভোট চাইতে গিয়ে বিএনপি নেতারা যে বারবার বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের যে নেতাকর্মীরা নিরীহ, কোনো অপরাধে যুক্ত নয় তারা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন এবং রাজনৈতিক তৎপরতা চালাতে দিতে চান। সে সময় তারেক রহমান রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন মত ব্যক্ত করেছিলেন, শেখ হাসিনা ছাড়া তাঁর কোনো সন্তান যদি দেশে এসে রাজনীতি করতে চান; জনগণ যদি তা মেনে নেয় তাহলে তাঁর কোনো আপত্তি থাকবে না।
শুধু বিএনপি নেতারা কেন; জামায়াত নেতারাও কি নৌকার ভোট পাওয়ার আশায় বিভিন্ন আসনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের তোয়াজ করেননি? এমন কথাও তো তারা বলেছিলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থকদের ওপর যত অত্যাচার হয়েছে তার সব করেছে বিএনপি; তারা বরং ওই নির্যাতিতদের রক্ষা করেছেন!
কথাগুলো বলার কারণ এই যে, রাজনৈতিক নেতারা যখন যে কোনো নীতিগত বিষয়ে ক্ষণে ক্ষণে অবস্থান পাল্টান, তখন তাদের রাজনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা যেমন প্রশ্নের মুখে পড়ে, তেমনি গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থাই অকার্যকর হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। আর রাষ্ট্র যখন এমন দ্বিচারিতায় ভোগে তখন শুধু দেশে-বিদেশে তার গ্রহণযোগ্যতাই কমে যায় না; শাসনব্যবস্থাও সংকটে পড়ে। দীর্ঘদিন দোর্দণ্ড প্রতাপে দেশ শাসনের পর বিগত আওয়ামী সরকার যে একসময় হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল, তাতে গণআন্দোলনের ভূমিকা প্রধান হলেও প্রতিপক্ষ বা ভিন্নমতকে মোকাবিলার জন্য ওই সরকার যে অগণতান্ত্রিক পথ বেছে নিয়েছিল, সেটির ভূমিকাও কম নয়।
আওয়ামী লীগ শুধু দেশের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দলই নয়; জনসংখ্যার একটা বড় অংশ এখনও তার সমর্থক ও ভোটার। এই বিশালসংখ্যক মানুষকে কলমের এক খোঁচায় নিজস্ব রাজনৈতিক মত চর্চার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা কোনোভাবে গণতান্ত্রিক তো নয়ই; প্রজ্ঞারও পরিচায়ক নয়।
বাগে পেয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার রাজনীতি এ দেশ কম দেখেনি। বরং বলা যায়, এহেন অসুস্থ রাজনীতিই বিপুল রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত একটা রাষ্ট্রকে পেছনে টেনে ধরে রেখেছে। এ ধারার রাজনীতির অবসান যখন সময়ের দাবি, তখন সরকারি দলের ঠিক এর উল্টো পথে চলা আর যা হোক প্রতিহিংসার রাজনীতিবিরোধী অবস্থান বোঝায় না। বিএনপি সরকার এখন যতগুলো দিক থেকে সংকটের সম্মুখীন; প্রতিহিংসার রাজনীতি জিইয়ে রেখে সেগুলো কীভাবে তারা সামাল দেবে– তা এক বড় প্রশ্নও বটে।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
সূত্র: সমকাল