
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত ১১ দলীয় রাজনৈতিক জোট মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই নানা মতবিরোধ, অসন্তোষ ও নেতৃত্ব সংকটে ভাঙনের মুখে পড়েছে। জোটের শরিক দলগুলোর প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব না মেলা, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে ভিন্ন অবস্থান, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) বিল নিয়ে বিতর্ক, সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-তে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সাবেক নেতাকর্মীদের যোগদান-সব মিলিয়ে জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
জোটসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, বর্তমানে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিই মূলত জোটটিকে একসঙ্গে ধরে রেখেছে। সংসদে বিরোধী রাজনীতি ও জুলাই আন্দোলনের দাবিগুলো বাস্তবায়নের বাইরে কার্যকর রাজনৈতিক সমন্বয় প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য দিন দিন প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে জোটের অন্যতম শরিক এনসিপি ও জামায়াতের সম্পর্ক। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দুই দলের মধ্যে প্রতিযোগিতার আবহ তৈরি হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে এনসিপি তাদের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নাম ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে জামায়াতও নিজস্ব প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নির্বাচনী সমীকরণে সমঝোতা না হলে জোটের ভিত আরও দুর্বল হতে পারে।
এনসিপির নেতারা প্রকাশ্যেই বলছেন, সংসদে এবং রাজপথে সরকারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জামায়াতের ভূমিকা তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী নয়। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন বিএনপির সঙ্গে রাজনীতি করার অভিজ্ঞতার কারণে জামায়াত অনেক ক্ষেত্রে আগ্রাসী বিরোধী ভূমিকা নিতে দ্বিধাগ্রস্ত। যদিও তারা এখনো মনে করে, শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে জোটের প্রয়োজন রয়েছে।
অন্যদিকে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুর মতে, এই জোট মূলত একটি নির্বাচনী সমঝোতা ছিল। দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচি বা আদর্শিক ঐক্যের ভিত্তিতে এটি গড়ে ওঠেনি। নির্বাচনের পর জোটের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার কথা থাকলেও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হওয়ায় এটি এখনো টিকে আছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে শরিকদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা হয়নি, যা অসন্তোষের কারণ হয়েছে।
জোটের অভ্যন্তরে সবচেয়ে বড় বিতর্কগুলোর একটি সৃষ্টি হয়েছে এনসিপিতে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সাবেক নেতাকর্মীদের অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্র করে। এনসিপি বলছে, তারা কোনো অপরাধী, গণহত্যার আসামি বা জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতাকারীকে দলে নেবে না। তবে ‘ক্লিন ইমেজের’ ব্যক্তিদের জন্য তাদের দরজা খোলা। এই নীতির আওতায় বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক পটভূমির ব্যক্তিরা এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন।
তবে জোটের অনেক নেতা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের সাবেক নেতাকর্মীদের দলে নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এসব ব্যক্তি রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারেন। যদিও এনসিপির নেতারা দাবি করছেন, নতুন যোগদানকারীদের বিষয়ে বিশেষ পর্যবেক্ষণ রাখা হচ্ছে এবং দলীয় আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
জামায়াত ও এনসিপির দূরত্ব আরও বেড়েছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) বিলকে কেন্দ্র করে। সংসদে উত্থাপিত ওই বিলের একটি বিষয়ে এনসিপি লিখিত সমর্থন দেওয়ায় জামায়াত ক্ষুব্ধ হয়। জামায়াতের নেতারা অভিযোগ করেন, জোটের পার্লামেন্টারি বোর্ডে আলোচনা না করেই এনসিপি এই অবস্থান নিয়েছে, যা যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতির পরিপন্থী। বিপরীতে এনসিপির বক্তব্য, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই অভ্যুত্থান- উভয় ক্ষেত্রেই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া তাদের নৈতিক দায়িত্ব।
জোটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মতবিরোধের জায়গা হলো রাষ্ট্র সংস্কার-সংক্রান্ত ‘সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটি’। এই কমিটিতে অংশগ্রহণ নিয়ে শরিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। জামায়াত যেখানে কমিটিতে থেকে সংস্কার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে আগ্রহী, সেখানে এনসিপির একটি অংশ এ বিষয়ে আপত্তি জানাচ্ছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও ঐকমত্য নেই। জামায়াতের নীতিনির্ধারকেরা শুরু থেকেই এককভাবে নির্বাচন করার পক্ষে। অন্যদিকে এনসিপি এবং কয়েকটি শরিক দল নির্বাচনী সমঝোতার সম্ভাবনা খোলা রাখতে চায়। ফলে সামনে সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, ততই জোটের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এরই মধ্যে জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন কার্যত জোট থেকে সরে গেছে। দলটির নেতারা অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনের সময় আসন সমঝোতায় তাদের গুরুত্ব দেওয়া হয়নি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। যদিও জোটের সমন্বয়করা বিষয়টিকে বড় সংকট হিসেবে দেখছেন না।
জামায়াত নেতৃত্ব অবশ্য জোটে একক কর্তৃত্বের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, সব দলকে সমান মর্যাদা দেওয়া হয় এবং যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আলোচনার মাধ্যমেই নেওয়া হয়। তবে শরিকদের একটি অংশের অভিযোগ, অধিকাংশ সিদ্ধান্ত আগে জামায়াত নির্ধারণ করে পরে তা অন্যদের সামনে উপস্থাপন করা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অভিন্ন দাবি এখনো জোটটিকে টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু আদর্শিক অবস্থান, সাংগঠনিক বিস্তার, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত নিরসন না হলে ১১ দলীয় জোটের সামনে বড় ধরনের পুনর্গঠন কিংবা ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বর্তমানে জোটের শরিকরা প্রকাশ্যে বিচ্ছেদের কথা না বললেও ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে ঐক্যের চেয়ে মতবিরোধই এখন বেশি আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।