
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান এক অভূতপূর্ব অধ্যায়। এই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে এবং একটি গণতান্ত্রিক রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। সেই গণতান্ত্রিকায়নের লক্ষ্যে একটি উদ্যোগ গণভোট। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় নির্বাচন। অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত অনুসারে একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে গণভোটও। আর রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা হিসেবে প্রস্তাবিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর ভিত্তিতে হবে গণভোট। ইতোমধ্যে সরকার আসন্ন আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট নিয়ে শুরু করেছে প্রচার প্রচারণাও।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। প্রচারণার মাধ্যম হিসেবে সরকারি যোগাযোগে লোগো ব্যবহার, সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ব্যানার টানানো, সারা দেশে ব্যানার, বিলবোর্ড, লিফলেট ও ফেস্টুন টানানো হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, এনজিওর সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে প্রচারণা। সরকারের বিশেষ উদ্যোগ ‘ভোটের গাড়ি—সুপার ক্যারাভান’ গত ২২ ডিসেম্বর থেকে দেশের রাজপথে যাত্রা শুরু করেছে। ১০টি সুসজ্জিত বড় ট্রাক, বিশাল ডিজিটাল স্ক্রিন এবং প্রচারণাসমৃদ্ধ এই বহরটি দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। বড় পর্দায় ভিডিও প্রদর্শনী, তথ্যচিত্র ও আলোচনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর ভিত্তিতে হতে যাওয়া গণভোট সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা। জনগণকে জানানো, সচেতন করার এই নানাবিধ ও অভিনব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু এই প্রশংসনীয় উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রচারণা। একটি নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার কি একটি পক্ষ নিয়ে প্রচার চালাতে পারে?
যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও গণভোট-সংক্রান্ত প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক আলী রীয়াজ গণমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেছেন, বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন, গণভোটে সংস্কারের পক্ষে ইতিবাচক প্রচারমূলক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনও আইনি বাধা নেই। তবে প্রশ্ন কি কেবল আইনি বাধা? আইনি বাধা না থাকা মানেই তা নৈতিক বা গণতান্ত্রিকভাবে সঠিক হওয়া নয়।
গণভোট বা রেফারেন্ডাম হলো সরাসরি গণতন্ত্রের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, যেখানে রাষ্ট্র বা সংবিধানের কোনও মৌলিক বিষয়ে নাগরিকরা সরাসরি রায় দেন। গণভোট তখনই হয়, যখন বিষয়টা এত গুরুত্বপূর্ণ যে কেবল রাজনীতিকরা নয়—পুরো জাতির মতামত দরকার। যেমন- সংবিধান পরিবর্তন বা নতুন সংবিধান প্রণয়নের সময়, কোনও অঞ্চল বা প্রদেশ আলাদা রাষ্ট্র হতে চাইলে, আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদনের ক্ষেত্রে, রাষ্ট্র কাঠামো বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের সময়, কোনও আইন তৈরি বা বাতিল। অর্থাৎ এমন সিদ্ধান্ত যেগুলো পুরো জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে, সেগুলোতেই গণভোট হয়ে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় কিছু প্রস্তাবের ভিত্তিতে প্রশ্ন তৈরি করে ভোটারদের থেকে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ মত গ্রহণ করা হয়। হ্যাঁ ভোট জয়ী হলে প্রস্তাবিত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, না ভোট জয়ী হলে বাতিল হয়। কিন্তু যখন একটি অন্তর্বর্তী সরকার, যাদের প্রাথমিক দায়িত্বই হলো একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা—কোনও নির্দিষ্ট পক্ষে প্রচারে নামে, তখন সেখানে নিরপেক্ষতার নীতি লঙ্ঘিত হয়। এটি কেবল রাজনৈতিক অসততাই নয়, বরং জনমতের ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টির নামান্তর।
তাত্ত্বিকভাবে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের কাজ হলো জনগণের সামনে তথ্যের সবদিক উন্মুক্ত করা। একটি প্রস্তাবনার সুফল এবং কুফল দুটোই জানানো সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু সরকার যখন কেবল ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার করে, তখন তা রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহার হিসেবে গণ্য হয়। অথচ ‘গণভোট ২০২৬, সংসদ নির্বাচন, দেশের চাবি আপনার হাতে’ শিরোনামে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে প্রচারিত একটি লিফলেটে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে কী কী লাভ সেই সম্পর্কিত ১১টি পয়েন্ট তুলে ধরা হয়েছে। আপনি কি এমন বাংলাদেশ চান, যেখানে- বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটিসমূহের সভাপতি নির্বাচিত হবেন, ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য পার্লামেন্টে একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য থাকবে বলে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার হলে কী সমস্যা হতে পারে, উচ্চকক্ষ কী? কীভাবে কাজ করে? উচ্চকক্ষের ক্ষমতার ব্যাপ্তি কিছুই উল্লেখ নেই। এবং শেষে লেখা আছে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে উপরের সবকিছু পাবেন। ‘না’ ভোট দিলে কিছুই পাবেন না। এই ভাষা কোনও ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের হতে পারে, কিন্তু একটি সরকারের মন্তব্য কী এমন পেশাদারিত্বহীন, অপ্রাতিষ্ঠানিক হতে পারে?
সংবিধান পরিবর্তন বা নতুন সংবিধান প্রণয়নের সময়, কোনও অঞ্চল বা প্রদেশ আলাদা রাষ্ট্র হতে চাইলে, আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদনের ক্ষেত্রে, রাষ্ট্র কাঠামো বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের সময়, কোনও আইন তৈরি বা বাতিল। অর্থাৎ এমন সিদ্ধান্ত যেগুলো পুরো জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে, সেগুলোতেই গণভোট হয়ে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় কিছু প্রস্তাবের ভিত্তিতে প্রশ্ন তৈরি করে ভোটারদের থেকে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ মত গ্রহণ করা হয়। হ্যাঁ ভোট জয়ী হলে প্রস্তাবিত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, না ভোট জয়ী হলে বাতিল হয়। কিন্তু যখন একটি অন্তর্বর্তী সরকার, যাদের প্রাথমিক দায়িত্বই হলো একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা—কোনও নির্দিষ্ট পক্ষে প্রচারে নামে, তখন সেখানে নিরপেক্ষতার নীতি লঙ্ঘিত হয়। এটি কেবল রাজনৈতিক অসততাই নয়, বরং জনমতের ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টির নামান্তর।
একটি অন্তর্বর্তী সরকার যেহেতু জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নয়, তাই তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব থাকে কেবল জনমতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কার এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা। কিন্তু তারা যখন নিজেরা কোনও এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য জনগণের কাছে ভোট চায়, তখন তারা তাদের ‘নিরপেক্ষ’ ভাবমূর্তি হারিয়ে একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। আইনগতভাবে এর কোনও সরাসরি নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও, নৈতিকভাবে এটি বড় ধরনের বিচ্যুতি। একজন নাগরিক আশা করেন যে সরকার তাকে সঠিক তথ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে, কোনও সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে নয়। ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানো মানে হলো জনগণের ওপর সরকারের নিজস্ব ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া। এটি নৈতিকভাবে এই কারণে অগ্রহণযোগ্য যে, এতে ‘না’ ভোটের সমর্থকদের রাষ্ট্রবিরোধী বা উন্নয়নবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার একটি প্রচ্ছন্ন হুমকি থাকে।
অথচ গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো প্রতিযোগিতার সমান সুযোগ। যখন রাষ্ট্র নিজেই তার সমস্ত শক্তি ও অর্থ (যা জনগণের ট্যাক্সের টাকা) ব্যয় করে একটি নির্দিষ্ট পক্ষের (হ্যাঁ ভোট) প্রচারণা চালায়, তখন বিপক্ষ মতের (না ভোট) জন্য কোনও জায়গা অবশিষ্ট থাকে না। এটি খেলার মাঠের এক পক্ষকে রেফারি বানিয়ে দেওয়ার মতো। আইনত হয়তো বাধা নেই, কিন্তু এটি ন্যায়বিচারের পরিপন্থি।
সরকারি প্রচারণাকে প্রায়শই ‘পাবলিক এডুকেশন’ বা জনশিক্ষা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এটি প্রায়ই ‘প্রপাগান্ডা’ বা অপপ্রচারে রূপ নেয়। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণাও অনুরূপ। তথ্য সেন্সরশিপের মাধ্যমে সরকার কেবল তাদের প্রস্তাবের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরছে এবং সম্ভাব্য নেতিবাচক দিকগুলো আড়াল করছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে যখন দিনরাত কেবল ‘হ্যাঁ’ ভোটের সুবিধা শোনানো হয়, তখন সাধারণ মানুষ বিকল্প কোনও চিন্তা করার সুযোগ পায় না। একে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ বা জোরপূর্বক সম্মতি উৎপাদন।
কিন্তু ভোট মানে কী? ভোট মানে কেবল একটি ব্যালট পেপারে সিল মারা নয়। ভোট হলো নাগরিকের মুক্ত ও স্বাধীন বিবেকের প্রতিফলন। একটি সার্থক ভোট হতে হলে নাগরিককে হতে হবে পর্যাপ্ত তথ্যসমৃদ্ধ এবং চাপমুক্ত। যখন সরকার পক্ষপাতমূলক প্রচারণা চালায়, তখন ভোট আর জনমত থাকে না, তা হয়ে যায় প্রপাগান্ডা।
প্রকৃত জনমত হলো সেটি, যা কোনও প্রকার প্রভাব বা প্রলোভন ছাড়াই গড়ে ওঠে। সরকার যখন নিজেই একটি পক্ষ হয়ে যায়, তখন সেই ভোটের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
সরকার অনেক সময় নিজেদের সংস্কার পরিকল্পনাকে ‘জনগণের চাওয়া’ বলে প্রচার করে। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, সরকারের ভেতরে থাকা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা কিছু নীতিনির্ধারক যেটিকে দেশের জন্য ভালো মনে করছেন, সেটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারি প্রচারণার অর্থ হলো- সরকার বা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে যে কী হওয়া উচিত। এরপর তারা জনগণের ওপর সেই সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। এতে জনগণের বৈচিত্র্যময় মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বরং একটি ‘মনোলিথিক’ বা একমুখী চিন্তাধারা চাপিয়ে দেওয়া হয়। গণতন্ত্রে জনগণের সম্মতির গুরুত্ব তখনই থাকে যখন সেখানে ‘না’ বলার সমান সুযোগ থাকে। সরকার যদি কেবল ‘হ্যাঁ’ প্রচার করে, তবে সেখানে ‘না’ বলার সুযোগ কার্যত নস্যাৎ করে দেওয়া হয়। ফলে গণভোটের প্রকৃত উদ্দেশ্য—জনগণের আসল ইচ্ছা জানা—তা ব্যাহত হয় এবং এটি কেবল একটি ‘হ্যাঁ-সূচক’ আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়।
গণভোট হলো জনগণের সার্বভৌমত্বের বহিঃপ্রকাশ। এখানে সরকারের ভূমিকা হওয়া উচিত একজন তথ্যদাতার, কোনও প্রচারকের নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উভয় পক্ষের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, যাতে নাগরিকরা বিতর্ক শুনে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সরকার যখন একতরফা প্রচারণায় নামে, তখন তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে একনায়কতন্ত্রের বীজ বপন করে। সুস্থ গণতন্ত্রের স্বার্থে রাষ্ট্র ও সরকারকে পক্ষপাতদুষ্ট প্রচারণা থেকে দূরে থাকা এবং কেবল প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠু করার দিকে নজর দেওয়াই বাঞ্ছনীয়।
লেখক: সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
সুত্র: বাংলা ট্রিবিউন