স্থপতি লুই কান, সংসদ ভবন ও জনগণের প্রত্যাশা

মোহাম্মদ বায়েজিদ সরোয়ার
ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৩৮

নির্বাচনের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। আসন্ন নির্বাচন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ। এ নির্বাচন কেবল সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়। বরং দেশের গণতন্ত্র, স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। পরপর তিনটি কারচুপির নির্বাচনের পর অবশেষে বাংলাদেশের মানুষ নিজের ভোট নিজে দেওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। এখন গণতন্ত্রের বাগানে ফুল ফোটার মৌসুম। দেশের লাখ লাখ তরুণ প্রথমবার সুষ্ঠু ও অবাধ একটি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
আমাদের জাতীয় সংসদ ভবনকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যকর্মগুলোর একটি ধরা হয়-যার স্থপতি ছিলেন লুই ইসাডোর কান। যদিও আমরা এর সম্মান রাখিনি। সংসদীয় সংস্কৃতি কার্যকর ও প্রাণবন্ত হয়নি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংসদ হলো রাষ্ট্রের সব কার্যক্রমের কেন্দ্র। এমন আপ্তবাক্য ক্ষমতাসীন রাজনীতিকরা গত ৫৪ বছরে কত বলেছেন; অথচ বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস দেশের ভোট রক্ষা করে দেশ রক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ওপর নির্ভর করছে দেশের সবার ভবিষ্যৎ।’ অর্থনীতি, বিনিয়োগ, জাতীয় নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা-সবকিছুর বিবেচনায় এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ একটি রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান বা বর্ষা বিপ্লব এ দেশের মানুষের সামনে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন পেরিয়ে গণতান্ত্রিক পথে যাত্রার সুযোগ করে দিয়েছে। প্রায় দেড় হাজার ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জাতির সামনে এ সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই এ নির্বাচনকে সফল করতেই হবে।

২.
সময়কাল আগস্ট ২০১৭। একটা প্রশিক্ষণের অংশ হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছি। নিউইয়র্ক থেকে নিউ জার্সির ওয়াশিংটন টাউনশিপে এলাম বন্ধুপ্রতিম মোহাম্মদ সিরাজ (শামিম ভাই) ও শাহানা সিরাজ দম্পতির বাসায়। ওয়াশিংটন টাউনশিপ থেকে পার্শ্ববর্তী স্টেট পেনসেলভেনিয়ার ঐতিহাসিক শহর ফিলাডেলফিয়া বেড়াচ্ছি। গাড়ি চালাচ্ছেন ও গাইডের ভূমিকায় রয়েছেন সপ্রতিভ শামিম ভাই। একসময় ফিলাডেলফিয়া ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাজধানী। এটি ছিল সেদেশের স্বাধীনতার সূতিকাগার।
ফিলাডেলফিয়ায় এসে বিশেষভাবে মনে পড়ল বিশ্ববিখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের (১৯০১-১৯৭৪) কথা। বাংলাদেশের বিশাল স্থাপত্য জাতীয় সংসদের স্থপতি ছিলেন তিনি। এ শহরেই বেড়ে উঠেছিলেন লুই কান। এখানকার পেনসেলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন। তার প্রিয় শহরে এসে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করলাম প্রয়াত লুই কানকে। এই মহান স্থপতির স্মৃতিময় বাড়িটাতে যদি যেতে পারতাম!
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ঘোষণা দিয়েছিলেন, ঢাকাকে পাকিস্তানের ‘দ্বিতীয় রাজধানী’ হিসাবে গড়ে তোলা হবে। ১৯৫৯ সালে পাকিস্তানের ‘সেকেন্ড ক্যাপিটাল কমপ্লেক্স’ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এর অংশ হিসাবেই শেরেবাংলা নগরে সংসদ ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা শুরু হয়। ১৯৬২ সালের জানুয়ারিতে এ দেশের মাটিতে প্রথম পা রাখেন লুই কান। সংসদ ভবনের মূল প্ল্যান লুই কান জমা দেন ১৯৬৪ সালে। তবে সংসদ ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৬৫ সালে।
ঢাকার এই সংসদ ভবন ছিল লুই কানের সত্যিকারের মনের মতো কাজ। মনপ্রাণ উজাড় করে দিয়েছিলেন তিনি এর ডিজাইনে। ১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর ১৯৮২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় সংসদের অষ্টম (এবং শেষ) অধিবেশনে প্রথমবার এ সংসদ ভবন ব্যবহৃত হয়।
লুই কান ছিলেন স্থপতির চেয়েও বেশি কিছু। ছিলেন স্রষ্টা ও কথক। ১৯৭৪ সালের জানুয়ারিতে শেষবার বাংলাদেশে এসেছিলেন। ১৯৭৪-এর ১৭ মার্চ তিনি মারা যান। লুই আই কানের ওপর স্থপতি আহমেদ খালেদ চমৎকার একটি গ্রন্থ লিখেছেন। গ্রন্থটির নাম ‘লুই আই. কান’ (২০১১)। বাংলা ভাষায় এটাই লুই কানের প্রথম পূর্ণাঙ্গ জীবনী।

৩.
বর্তমান জাতীয় সংসদ ভবনটিকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যকর্মগুলোর একটি ধরা হয়। এছাড়াও সংসদ ভবন হিসাবেও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভবন এটি। এমন সংসদ ভবনকে আমরা পরিণত করেছি গালাগাল ও স্তুতিবাদের প্রাঙ্গণে। এখানে গণবিরোধী আইনও প্রণীত হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকালে কয়েক লাখ তরুণ-তরুণী সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জমায়েত হয়েছিল। সেটি ছিল জুলাই বিপ্লবের আইকনিক এক ছবি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেই বিকালে উত্তেজিত জনতার একাংশ সংসদ ভবনে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর ও তাণ্ডব চালায়। কিছু জিনিসপত্র চুরিও হয়। মারামারি ও খুনের পর্ব অবশ্য পাকিস্তান পর্বেই (পুরাতন সংসদ ভবনে) ‘রাজনীতি প্রিয়’ বাঙালি সংসদ-সদস্যরা সুসম্পন্ন করেছেন! যা কিছু ভালো ও গৌরবের-সেটাকেও পচানো, নষ্ট ও বিতর্কিত না করা পর্যন্ত তো বাঙালির ঘুম হয় না!
নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব যেমন অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের, একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও। সশস্ত্র বাহিনীরও এক্ষেত্রে গুরুদায়িত্ব রয়েছে। নির্বাচনি মাঠে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য, গুজব ও ডিপফেকের মতো হুমকি প্রতিহত করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনগণের মধ্যে শঙ্কা ও উদ্বেগ আছে, অতি দ্রুত তা নিরসন করতে হবে। চোরাগোপ্তা হামলা, লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এবারের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে সশস্ত্র বাহিনীসহ সব বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন থাকবে। সেক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে কোনো অজুহাতই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালাতে হবে। ডিজিটাল মাধ্যমে গুজব ও অপতথ্য যারা ছড়াবেন, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা নানা সময়ে সতর্ক করে আসছিলেন যে, অবৈধ অস্ত্র ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া গেলে নির্বাচনের পরিবেশের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। এর সঙ্গে সীমান্তে অবৈধ পারাপার, কালোটাকার প্রভাব, জাল টাকার কারবার এবং অস্ত্র চোরাচালানও নির্বাচনকেন্দ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। পার্শ্ববর্তী একটি দেশ থেকেও বিপদ আসতে পারে।
১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ একটা অধ্যায়। বাংলাদেশ এক ক্রান্তিকাল পার করছে। একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেশকে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ দেখাতে পারে।
লুই কান তার পরিকল্পিত ও ডিজাইনকৃত সংসদ ভবন নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতেন। মানুষে মানুষে একত্র হওয়ার প্রেরণাকে তিনি বলতেন ‘সম্মেলন’। সম্মেলনের এমনই এক ধারণা থেকে এক রাতে (১৯৬২) ফিলাডেলফিয়ায় তার মনে সংসদ ভবনের প্ল্যানের মূল আইডিয়া মাথায় এসেছিল। এটি ছিল ‘সংযোগের স্থাপত্য’। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পেনসেলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের এসব স্বপ্নের কথা বলতেন শিক্ষক লুইকান। তখনো কিন্তু সংসদ ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। অথচ সংসদ ভবন চালু হওয়ার পর (১৯৮২) এই সংসদ বিশ্বকে তেমন কোনো অনুপ্রেরণাময় বার্তা দিতে পারেনি। বরং দিয়েছে বিষণ্ন কিছু বার্তা। ভাগ্যিস লুই কান এসব জানতে পারেননি।
‘গণতন্ত্রের প্রতীক’ আমাদের অসাধারণ সুন্দর সংসদ ভবন হয়ে উঠুক রাষ্ট্রের সব কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু। আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার স্থল-যেখানে জনপ্রতিনিধিরা জনগণের কথা বলবেন। দেশের জন্য যুগোপযোগী সুন্দর সুন্দর আইন প্রণয়ন করবেন। এই সংসদ ভবন হোক গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু।
সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এ নির্বাচন করতেই হবে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের নতুন পথচলা শুরু হোক। এ মহাযাত্রা সবার।


মোহাম্মদ বায়েজিদ সরোয়ার : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, গবেষক ও বিশ্লেষক