ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া সম্মেলন ও চা বাগানের ম্যানেজার বাংলো সংরক্ষণ প্রসঙ্গে কিছু কথা

মোঃ বায়েজিদ সরোয়ার
ডেস্ক রিপোর্ট
  ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩২

ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া দিবস পালন করা হয় ৪ এপ্রিল তারিখে। ১৯৭১ সালের এই দিনে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার বাংলোয় স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম আভিযানিক সমন্বয় বৈঠক বা কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিছুটা পাহাড়ি ও চা বাগানের শ্যামলিমায় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বৈঠকটি ছিল ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই দিনে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী ইউনিটগুলোর কমান্ডাররা ও কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ বাঙালি সেনা কর্মকর্তা একত্রিত হয়েছিলেন প্রতিরোধযুদ্ধের সমস্যাগুলো আলোচনা এবং সম্মিলিত কর্মপন্থা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে। তেলিয়াপাড়া কনফারেন্সের রণকৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো বিশেষতঃ যুদ্ধরত ব্যাটালিয়ানগুলো নিয়ে সম্মিলিত মুক্তিফৌজ গঠন, ‘‘পাপা টাইগার” হিসেবে পরিচিত কর্নেল মো. আতাদউল গণি ওসমানীকে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান, সামরিক অঞ্চল গঠন ও রাজনৈতিক সরকার গঠনের প্রস্তাব; ইত্যাদি ছিল মুক্তিযুদ্ধের টার্নিং পয়েন্ট। ১০ এপ্রিল তারিখে তেলিয়াপাড়ায় দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে জেলা) মাধবপুর থানার অন্তর্গত ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক কিংবা তেলিয়াপাড়া রেলস্টেশন থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার অভ্যন্তরে ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা স্থানে অবস্থিত তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের ম্যানেজারের আবাসস্থল বা বাংলো। এখানেই গড়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রথম অনানুষ্ঠানিক সদরদপ্তর। বাংলোটি সংরক্ষণ করার জন্য সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই বাংলোটিকে সংরক্ষণ করে জাদুঘরে রূপ দেওয়ার কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। এই লেখায় তেলিয়াপাড়া সম্মেলনের গৃহীত সিদ্ধান্ত, এর তাৎপর্য এবং বাংলো সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।


তেলিয়াপাড়া দিবস পালন
গত ৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে তেলিয়াপাড়া চা বাগানে নানা আয়োজনে এবার ’তেলিয়াপাড়া দিবস’ পালিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে হবিগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ইউনিট কমান্ডের উদ্দ্যোগে বেলা ১১টায় পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা হয়। পরে দুপুর ১টায় তেলিয়াপাড়া চা বাগানের স্মৃতিসৌধের পাশে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘তেলিয়াপাড়া থেকেই মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল।’ এই মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষযক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, স্থানীয় কয়েকজন সংসদ সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন হবিগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ইউনিট কমান্ডের আহ্বায়ক গোলাম মোস্তফা রফিক। অনুষ্ঠানে বক্তারা মুক্তিযুদ্ধে তেলিয়াপাড়া বৈঠকের গুরুত্ব তুলে ধরেন।


ফিরে দেখা: তেলিয়াপাড়া সম্মেলনের প্রেক্ষাপট
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত হামলার পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালি সেনা সদস্যরা নিজ নিজ অবস্থানে বিদ্রোহ করে স্বাধীনতাযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। বাঙালি সেনাদের এ বিদ্রোহ ছিল স্বপ্রণোদিত ও স্বতঃস্ফূর্ত। মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার পর জাতি নেতৃত্বশূন্য হয়ে এক মহা-অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। ২৭ মার্চ তারিখে চট্টগ্রামে অবস্থিত ৮ ইস্ট-বেঙ্গলের অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।
যুদ্ধের প্রথম দিকে বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাঁচটি বাঙালি ব্যাটালিয়ন বা ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ, আনসার এবং মুজাহিদদের মধ্যে কোনো সমন্বয় ছিল না। পরে ধীরে ধীরে এসব বাহিনী নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। নিজেদের মধ্যে এই যোগাযোগ রক্ষায় সেনা কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিদ্রোহী বাঙালি সেনারা ক্রমেই বুঝতে পারে যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য তাদের মধ্যে সমন্বয় দরকার। এ ছাড়া স্থানীয় ও বিচ্ছিন্নভাবে শুরু হওয়া প্রতিরোধ যুদ্ধকে একটি একক নেতৃত্বের আওতায় আনা প্রয়োজন। সর্বোপরি যুদ্ধের বৈধতার জন্য রাজণৈতিক সরকার দরকার। সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে শত্রুকে মোকাবিলার গুরুত্ব অনুধাবন করে বাঙালি সেনা কর্মকর্তারা ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল তেলিয়াপাড়া চা বাগানে একটি সম্মিলিত বৈঠকের আয়োজন করেন।

তেলিয়াপাড়াকে সদরদপ্তর নির্বাচন ও বৈঠকের তারিখ নির্ধারণ
এই প্রেক্ষাপটে তেলিয়াপাড়ার ভৌগোলিক অবস্থানও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। সীমান্তের নিকটবর্তী চা বাগানবেষ্টিত, পাহাড়ি এলাকা এবং অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এ স্থানটি সদর দপ্তর হিসেবে উপযোগী ছিল। এসব কৌশলগত কারণেই ৪ ইস্ট বেঙ্গল অধিনায়ক মেজর খালেদ মোশাররফ তেলিয়াপাড়াকে সদরদপ্তর হিসেবে নির্বাচন করেন এবং ২৯ মার্চ তার ব্যাটালিয়ান সদরদপ্তর মাধবপুর থেকে তেলিয়াপাড়া চা বাগানে স্থানান্তর করেন।
সেখান থেকে পূর্ব যোগাযোগের ভিত্তিতে ২ এপ্রিল তারিখে সীমান্ত এলাকায় তেলিয়াপাড়া বিওপির কাছে ভারতীয় বিএসএফ-এর পূর্বাঞ্চলীয় মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার ভি সি পান্ডের সঙ্গে মেজর খালেদের সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় হয়। উভয়পক্ষের আলোচনায় ৪ এপ্রিল তেলিয়াপাড়ার চা বাগানের ম্যানেজার বাংলোতে বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তাদের একটি সমন্বয় সভা অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হয়। মেজর খালেদ ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার ভি সি পান্ডের সহযোগিতায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত সেনা কর্মকর্তা ও ভারতীয় সরকারের প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে ৪ এপ্রিল তেলিয়াপাড়ায় স্বাধীনতাকামী সেনা কর্মকর্তারা যখন প্রথম সমন্বয় বৈঠক করছিলেন, তখন ওই দিনই অর্থাৎ ৪ এপ্রিল ভারতের দিল্লিতে ঘটল আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ওই দিন তাজউদ্দীন আহমদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সাংগঠনিক পরিকল্পনা শুরু করেন। সে এক অন্য ইতিহাস।

 

মুক্তিযুদ্ধের অগ্রপথিকদের অংশগ্রহণ:আশ্চর্য এক যোগাযোগ
২৭ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৪ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট (বেবি টাইগার্স) এবং ২৮ মার্চ জয়দেবপুরে (রাজবাড়ী) ২ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট (জুনিয়ার টাইগার্স) বিদ্রোহ করে। মেজর খালেদ মোশাররফ (পরে ব্রিগেডিয়ার, সিজিএস ও বীর উত্তম) ২৯ মার্চ তার সদরদপ্তর তেলিয়াপাড়া চা বাগানে স্থানান্তর করেন। ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক মেজর কে এম সফিউল্লাহ (পরে মেজর জেনারেল, সেনাপ্রধান ও বীর উত্তম) পূর্বে অবস্থানরত টাঙ্গাইলের কোম্পানি এবং ময়মনসিংহে অবস্থানরত আরেকটি কোম্পানি নিয়ে কিশোরগঞ্জে উপস্থিত হন। এক চিঠিতে মেজর খালেদ মোশাররফ মেজর সফিউল্লাহকে ঢাকা আক্রমণের পরিকল্পনা বাতিল করে ব্যাটালিয়নসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যাওয়ার অনুরোধ করেন। সে অনুযায়ী মেজর সফিউল্লাহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে তেলিয়াপাড়া চা বাগানে ১ এপ্রিল তার সদরদপ্তর স্থাপন করেন।
এদিকে ৮ ইস্ট বেঙ্গলের (দি পাইওনিয়ারস) অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান (পরে লে. জেনারেল, সেনাপ্রধান, প্রেসিডেন্ট ও বীর উত্তম) রামগড় থেকে আগরতলা হয়ে ৩ এপ্রিল তেলিয়াপাড়া চা বাগানে আসেন। তেলিয়াপাড়ায় ২য় ও ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গলের সদরদপ্তর হওয়া সে সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এর সঙ্গে যুক্ত হলেন মেজর জিয়া, যার নেতৃত্বাধীন ৮ ইস্ট বেঙ্গল তখন চট্টগ্রামে যুদ্ধ করছিল। পরে এই তিনজন যুদ্ধনায়কের নেতৃত্বে গঠিত হয় ৩টি ফোর্স (ব্রিগেড)। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ তার ১০ এপ্রিল এর বিখ্যাত ভাষণে এই তিনজন সমরনায়ক সম্পর্কে বলেন ”পূর্বাঞ্চলের এই তিন বীর সমর পরিচালক ইতোমধ্যেই বৈঠকে মিলিত হয়েছেন...”।
ব্রিগেডিয়ার ভি সি পান্ডে আগরতলা থেকে অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মো. আতাউল গণি ওসমানী (পরে জেনারেল) ও অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল মো. আব্দুর রবকে (পরে মেজর জেনারেল) ৪ এপ্রিল সকালে তেলিয়াপাড়ায় নিয়ে আসেন।
মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে ১০ মার্চ ১৯৭১ তারিখে মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান কর্নেল আতাউল গণি ওসমানীকে তার সামরিক উপদেষ্টা নিয়োগ করেন।

সমরনায়কদের অনন্য যে সম্মিলনী
সকাল ১১টায় কর্নেল ওসমানীর সভাপতিত্বে সভার কার্যক্রম শুরু হয়। এই ঐতিহাসিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন: কর্নেল মো. আতাউল গণি ওসমানী (অব.) এম এন এ, লে. কর্নেল মো. আব্দুর রব (অব.) এম এন এ, লে. কর্নেল সালাহউদ্দীন মোহাম্মদ রেজা, মেজর কাজী নুরুজ্জামান (অব.), মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর কে এম সফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর শাফায়াত জামিল, মেজর নূরুল ইসলাম ও মেজর মইনুল হোসেন চৌধুরী।
ভারতীয় বিএসএফ-এর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান ব্রিগেডিয়ার ভি সি পান্ডে ও আগরতলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওমেস সায়গল পর্যবেক্ষক হিসেবে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়াও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিদ্রোহী মহকুমা প্রশাসক কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদও উপস্থিত ছিলেন।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে তখন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টসহ অন্যান্য ইউনিটের বেশ কয়েকজন তরুণ সেনা অফিসার এবং মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ মহকুমার বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাও এই সময় তেলিয়াপাড়া চা বাগানে উপস্থিত ছিলেন। তবে তারা সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেননি। তেলিয়াপাড়া সম্মেলন আয়োজন ও পরবর্তীতে তেলিয়াপাড়ার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কর্মকাণ্ডে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা ও স্থানীয় জনগণ ব্যাপক অবদান রেখেছিলেন। এর মধ্যে তেলিয়াপাড়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ (বর্তমান কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতা দেওয়ান আশ্রাফ আলীর অবদান ছিল অসাধারণ।

ঐতিহাসিক সম্মেলনের সিদ্ধান্তসমূহ
সকাল ১১টায় সভার কার্যক্রম শুরু হলে এর লক্ষ্য ও বিষয়বস্তু উপস্থাপন করেন মেজর খালেদ মোশাররফ। ঐতিহাসিক এ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তৎকালে যেসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল: ১. অস্ত্র, গোলাবারুদ ও রেশন সংগ্রহ, ২. প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন ও ভারতের সীমান্তবর্তী ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি, ৩. যুদ্ধ পরিচালনার একক কমান্ড চ্যানেল প্রতিষ্ঠা ও কর্নেল ওসমানীকে সমন্বয় সাধন ও পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান, ৪. মনিটরিং সেল গঠন, ৫. ৪টি সামরিক অঞ্চল (সেক্টর) প্রতিষ্ঠা, ৬. ৪ জন কমান্ডারকে (মেজর জিয়া, মেজর সফিউল্লাহ, মেজর খালেদ ও মেজর আবু ওসমান চৌধুরী) সামরিক অঞ্চলের দায়িত্ব বণ্টন , ৭. মেজর জিয়াউর রহমানের বাহিনীর (৮ ইস্ট বেঙ্গল) সৈন্য বৃদ্ধি, ৮. বাংলাদেশ সরকার গঠনের প্রস্তাব, ৯. কর্নেল ওসমানীকে রাজনৈতিক সরকার গঠনের উদ্যোগ নেয়ার দায়িত্ব অর্পণ ও ১০. পরবর্তী পর্যালোচনা বৈঠকের সিদ্ধান্ত। ওই বৈঠক শেষে কর্ণেল ওসমানী নিজের পিস্তল থেকে ফাঁকা গুলি ছুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

তেলিয়াপাড়ার দ্বিতীয় সম্মেলন (১০ এপ্রিল)
৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্তানুযায়ী ১০ এপ্রিল তেলিয়াপাড়ায় দ্বিতীয় সেনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম সভায় উপস্থিত প্রায় সবাই ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন। এ সভাটি প্রথম সভার সিদ্ধান্ত মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল।
সভার শুরুতেই কর্নেল মো. আতাউল গণি ওসমানীর কাছে গণপ্রতিনিধিদের নিয়ে সরকার গঠনের ব্যাপারে তিনি কতদূর অগ্রসর হয়েছেন তা জানাতে অনুরোধ করা হলে তিনি জানান, এ বিষয়টি নিয়ে সীমান্ত অতিক্রমকারী বেশ কিছুসংখ্যক এমএনএ এবং এমপিএর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। অধিকাংশ গণপ্রতিনিধিই বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছেন। তাজউদ্দীন আহমদ শিগগিরই একটি বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা দেবেন বলে তাকে আশ্বস্ত করেছেন। বিক্ষিপ্ত সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধটিকে সমন্বিত অ্যাকশনে রূপ দেওয়া এবং কমান্ড চ্যানেলে আনার লক্ষ্যে এদিন পুরো দেশটিকে ৪টির স্থলে ৬টি সামরিক অঞ্চলে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

তেলিয়াপাড়া সম্মেলন এবং অতঃপর
এ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ সরকার গঠনের আগে। সভায় লিখিত আকারে কোনো সিদ্ধান্ত সংরক্ষণ করা হয়নি। মৌখিকভাবে বাহিনীর সংগঠন, নেতৃত্ব ও যুদ্ধ পরিচালনার যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন পায়। ১০ এপ্রিল নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ঐতিহাসিক বেতার ভাষণে এই সভার সিদ্ধান্তের কিছু অংশ উচ্চারিত হয়েছিল। পরে এই সভার সিদ্ধান্তগুলোকে পরিবর্ধন, পরিমার্জন, সংশোধন, সংযোজনের মাধ্যমে আরও সময়োপযোগী করে তোলা হয়।
এ সভা আমাদের বাহিনীকে সাংগঠনিক ধারণা দেয় এবং তা মুক্তিবাহিনী পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করে। এই সভাতেই একটি রাজনৈতিক সরকার গঠনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এই সম্মেলনের ফলে পরিকল্পনাহীন বিদ্রোহ একটি যুদ্ধে রূপ নেয়। স্পষ্ট হয়ে ওঠে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের রূপরেখা।
তেলিয়াপাড়ার সম্মেলনের গুরুত্ব নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার লিখেন, যখন জাতি নেতৃত্বহীন এবং নেতারা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না, তখন সেনা কর্মকর্তাদের এ সুপারিশ অস্থায়ী সরকার গঠন ও যুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়...। তাজউদ্দীনসহ রাজনৈতিক নেতারা যখন জানতে পারলেন, বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক সরকার গঠনের প্রস্তাব করেছেন, তখন তারা আশ্বস্ত হলেন এই ভেবে যে, অন্তত যুদ্ধের জন্য কিছুটা অগ্রসর হওয়া গেছে। সেনা কর্মকর্তাদের এই কাজটি খুবই প্রশংসাযোগ্য ছিল। (১৯৭১ ভেতরে বাইরে)।
এদিকে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল জনাব তাজউদ্দীন আহমদ প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। এই ঘোষণারই আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়ন ঘটে ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়ার চুয়াডাঙ্গা সীমান্তবর্তী বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে (পরে মুজিবনগর) প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। বলা যায় যে, তেলিয়াপাড়া কনফারেন্সেরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনার লক্ষ্যে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করেছিল। নবগঠিত বাংলাদেশ সরকার, ১২ এপ্রিল কর্নেল মো. আতাউল গণি ওসমানীকে (ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদায়) সরকারিভাবে বাংলাদেশ ফোর্সেসের ‘‘প্রধান সেনাপতি” (কমান্ডার-ইন-চিফ) হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে।

তেলিয়াপাড়া:যখন গ্রন্থের ভুবনে
হবিগঞ্জের সন্তান, সমাজ সংগঠক লেখক ও গবেষক মুহম্মদ সায়েদুর রহমান তালুকদার তেলিয়াপাড়া সম্মেলন নিয়ে লিখেছেন অসাধারণ এক গবেষণামূলক গ্রন্থ “মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিসাক্ষী তেলিয়াপাড়া”(২০২৩)। লেখক ও গবেষক শেখ ফজলে এলাহী-এর ‘মুক্তিযুদ্ধে হবিগঞ্জ জেলা’ বইটিতে তেলিয়াপাড়ার ঘটনা আলোচিত হয়েছে।
তেলিয়াপাড়া সম্মেলনে উপস্থিত মেজর জেনারেল কে. এম. সফিউল্লাহ, বীর উত্তম তার গ্রন্থ ‘মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ’ গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। কর্নেল সাফায়েত জামিল, বীর বিক্রম তার ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ রক্তাক্ত মধ্য-আগষ্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর’ গ্রন্থে তেলিয়াপাড়া সম্মেলনের কথা লিখেছেন। মেজর আখতার আহমেদ, বীরপ্রতীকের বহুল পঠিত ‘বার বার ফিরে যাই’ গ্রন্থে তেলিয়াপাড়ার বিষয়টি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
তখন তিনি লে. হিসেবে ৪ ইস্ট বেঙ্গলের সদরদপ্তরে কর্মরত ছিলেন। এ ছাড়া তেলিয়াপাড়া সম্মেলনে নিয়ে লিখেছেন: মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীরপ্রতীক (অব.), মেজর কামরুল হাসান ভূঁইয়া, কর্নেল মোহাম্মদ আবদুল হক (অব.), লে. কর্নেল মুহম্মদ লুৎফুল হক (অব.) ও মেজর সাইদুল ইসলাম (অব.) প্রমুখ।

তেলিয়াপাড়ায় মুক্তিযুদ্ধের যত স্মারক
মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মিশে আছে এই তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের বাংলোয় ও চা-বাগান এলাকায়। তেলিয়াপাড়াতে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল এবং তার সঙ্গে সংযুক্ত ইপিআর পুলিশ ও বেসামরিক জনবল নিয়ে ৩নং সেক্টর গঠিত হয় এবং ১৯ মে ১৯৭১ পর্যন্ত তেলিয়াপাড়া ছিল ৩নং সেক্টরের সদরদপ্তর। এখানেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু হয়। হানাদার বাহিনীর সঙ্গে বেশ কিছু রক্তক্ষয়ী সম্মুখ যুদ্ধেরও সাক্ষী বাংলোটি। কিন্তু ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি আজও তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের ব্যবস্থাপকদের বাংলো হিসেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে বাংলোর পাশেই নির্মিত হয়েছে তেলিয়াপাড়া স্মৃতিসৌধ। ১৯৭৫ সালের জুন মাসে স্মৃতিসৌধটি উদ্বোধন করেন সাবেক সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ। বুলেটের আকৃতিতে তৈরি এই স্মৃতিসৌধের প্রবেশের পথে রয়েছে দুটি ফলক। তাতে অঙ্কিত রয়েছে কবি শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি' শিরোনামের বিখ্যাত কবিতার পঙ্‌ক্তিমালা। এই স্মৃতিসৌধের পাশেই বিজিবি শ্রীমঙ্গল সেক্টরের ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সেনাসদর’ শিরোনামে একটি স্মৃতিফলক আছে। চা-বাগানের সবুজের বেষ্টনীতে স্মৃতিসৌধ ছাড়াও আছে একটি প্রাকৃতিক হৃদ। লাল-শাপলা ফোটা এই বর্ষাকালে অপরূপ হয়ে ওঠে।

তেলিয়াপাড়া ও ২ ইস্ট বেঙ্গলের কিছু প্রাসঙ্গিক ঘটনা
তেলিয়াপাড়া নিয়ে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলের (জুনিয়ার টাইগার্স) অফিসার ও সৈনিকদের ভেতর গর্ব ও স্মৃতিময়তা রয়েছে। ২ ও ৪ ইস্ট বেঙ্গলের যৌথ সদর দপ্তরেই তেলিয়াপাড়া সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯ মে পর্যন্ত তেলিয়াপাড়া ছিল ২ ইস্ট বেঙ্গল ও ৩ নম্বর সেক্টরের সদরদপ্তর। বৃহত্তর সিলেট জেলার মুক্তিযুদ্ধে এই ব্যাটালিয়নের গৌরবজনক অবদান রয়েছে।
উল্লেখ্য, তেলিয়াপাড়া সম্মেলন যখন চলছিল, তখন ক্যাপ্টেন এম. আজিজুর রহমান (পরে মেজর জেনারেল ও বীর উত্তম) এর নেতৃত্বে ২ ইস্ট বেঙ্গলের একটি কোম্পানি শেরপুর, সাদীপুর ও সিলেট শহর অঞ্চলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। মেজর সি আর দত্ত তখন সিলেটের যুদ্ধে নিয়োজিত ছিলেন।
২০০১-২০০৩ সময়ে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল সিলেট সেনানিবাসে অবস্থিত ছিল। এই সময়ে আমি সিলেটের এই ইউনিটে কর্মরত ছিলাম। সেনা সদরের একটি প্রকল্পের আওতায় সিলেট জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব ছিল এই ব্যাটালিয়নের। একই সঙ্গে ২ ইস্ট বেঙ্গলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও আমরা কাজ করছিলাম। শীতকালীন অনুশীলন, গ্রীষ্মকালীন অনুশীলনসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ইত্যাদি হবিগঞ্জ, চুনারুঘাট ও তেলিয়াপাড়া অঞ্চলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর জন্য আমাদের অনেকবার তেলিয়াপাড়া যেতে হয়েছে।

তেলিয়াপাড়ার যুদ্ধ ও একটি ডকুমেন্ট্রি
২০০৩ সালে সিলেট সেনানিবাসে ২ ইস্ট বেঙ্গলের অফিসারদের একটি টিম ব্রিগেড স্টাডি পিরিওডের অংশ হিসেবে ‘তেলিয়াপাড়া যুদ্ধ’ উপস্থাপন করে। তখন এই ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক বা কমান্ডিং অফিসার ছিলেন অত্যন্ত গতিশীল সেনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল মোহাম্মদ ইউসুফ (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল)।
সেনাবাহিনীর ঐতিহ্য এবং বিষয়টি প্রাণবন্ত করার জন্য স্টাডি পিরিওডের আগে তেলিয়াপাড়া যুদ্ধের উপর একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও/ডকুমেন্টরি দেখানো হয়। এর একটা অংশে ২ ইস্ট বেঙ্গলের অফিসার ও সৈনিকরা মিলে ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া সম্মেলনের মহড়াও ছিল। ব্যাটালিয়ানের কয়েকজন অফিসার ও সৈনিক খাকি পোশাক পরে তেলিয়াপাড়া সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিখ্যাত সেনানায়কদের ভূমিকায় অংশ (অভিনয়) নিয়েছিল। প্রযুক্তি ও শিল্প বিচারে ভিডিওটি ছিল খুবই সাধারণ মানের। কিন্তু এতে জড়িয়ে ছিল রেজিমেন্টের ইতিহাস-গর্বের আবেগে ভরপুর। তেলিয়াপাড়া যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অবসরপ্রাপ্ত হাবিলদার আবদুর রহমান, বীর বিক্রম এই অনুষ্ঠানে এসেছিলেন এবং তার যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন।

ঐতিহাসিক বাংলো সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
বিভিন্ন সময়ে ঐতিহাসিক ম্যানেজার বাংলোটি সংরক্ষনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ২০২৫ সালে ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন’-এর সভাপতি কর্নেল মোহাম্মদ আবদুস সালাম, বীরপ্রতীক (অব.) বাংলোটি সংরক্ষণের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। গত ০৭ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে সিলেটের এই কৃতী সন্তান ও তেলিয়াপাড়ায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের গৌরবধারী কর্নেল মোহাম্মদ আবদুস সালাম চা বাগানের বাংলোটিকে সংরক্ষণের অনুরোধ করে তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম, বীর প্রতীককে একটি চিঠি দেন।
চিঠিতে বলা হয়, প্রয়াত সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ, বীর উত্তম অনেকবার তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের বাংলোকে সংরক্ষণ-রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নিয়েও ব্যর্থ হন। বর্তমানে বাংলোটি এনটিসির অধীনে রয়েছে। এনটিসির বেশির ভাগ মালিকানা সরকারের। বাংলোটিকে সশস্ত্র বাহিনীর প্রথম সদর দপ্তর হিসেবে রক্ষণাবেক্ষণ ও তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের মাধ্যমে একটি পরিদর্শন এলাকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যেতে পারে।
পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী, দৈনিক প্রথম আলোকে (৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫) বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত গুরুত্বপূর্ণ স্থানটিতে জাদুঘর নির্মানের পরিকল্পনা রয়েছে। দর্শনার্থীরা যাতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে পারেন, সে জন্য এই পরিকল্পনা। সেক্ষেত্রে এনটিসিকে বিকল্প স্থানে নতুন স্থাপনা নির্মাণ করে দেওয়া হবে।
বিষয়টি আমলে নিয়ে এনটিসিকে দেওয়া বাংলোসহ সংশ্লিষ্ট জমির লিজ বাতিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসনকে চিঠি দেয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এরপর হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসন থেকে মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানে সরকার জাদুঘর নির্মাণ করলে এনটিসির আপত্তি থাকবে না। তবে এনটিসির স্থাপনার জন্য বিকল্প স্থাপনা নির্মাণ করে দিতে হবে। (প্রথম আলো, ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫)। যতদূর জানা যায়, তেলিয়াপাড়ায় বিষয়োক্ত যাদুঘর নির্মাণের কাজে অগ্রগতি হয়েছে।

তেলিয়াপাড়া বিষয়ে রাওয়ার কিছু উদ্যোগ
সাম্প্রতিককালে ‘রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’ (রাওয়া) আয়োজিত জাতীয় দিবস, সেমিনার, স্মরণসভা ও আলোচনা সভায় তেলিয়াপাড়ার বিষয়টি গুরুত্ব নিয়ে আলোচিত হয়েছে। বিশেষত বিভিন্ন সময়ে বর্তমান রাওয়া চেয়ারম্যান, লেখক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মোহাম্মদ আবদুল হক তার লেখা, টকশো এবং বক্তৃতায় তেলিয়াপাড়ার গুরুত্ব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন (মুক্তিযুদ্ধের টার্নিং পয়েন্ট তেলিয়াপাড়া, দৈনিক বাংলা, কর্নেল মোহাম্মদ আবদুল হক, তারিখ ৪ এপ্রিল, ২০২৩)।
রাওয়ার থিংক ট্যাংক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘রাওয়া রিসার্চ এন্ড স্টাডি ফোরাম (আরআরএসএফ)’ গঠিত হয়েছে। এই থিংক ট্যাংক জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ইস্যুসহ এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ইতিহাসবিষয়ক কাজে গবেষণা করছে।

ম্যানেজার বাংলো সংরক্ষণ সম্পর্কে কিছু কথা
‘মুক্তিযুদ্ধে তেলিয়াপাড়ার’ জন্য তৈরি ভিডিও বা ডকুমেন্ট্রিটি শুরু হয়েছিল তেলিয়াপাড়া চা বাগানের শ্রমিকদের ঐতিহ্যবাহী একটি গান দিয়ে। এই গানে ফুটে ওঠে তাদের কঠিন জীবন সংগ্রাম ও সুখ-দুঃখের কথা।
বাংলোটি সংরক্ষণের সময় মনে রাখতে হবে যে, সেখানে এমন কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা উচিত না, যা চা বাগানের পরিবেশ বিশেষত দরিদ্র এসব চা শ্রমিকের জীবন ও জীবিকার ক্ষতি করে।
তেলিয়াপাড়া সম্মেলন এবং মুক্তিযুদ্ধকালে এই চা বাগানের হতদরিদ্র শ্রমিকরা সেনাবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। ২৮/২৯ মার্চ রাতে মেজর খালেদ মোশাররফের অনুরোধে চা বাগানের শত শত শ্রমিক সারা রাত কাজ করে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে তেলিয়াপাড়া চা বাগাান থেকে ত্রিপুরার সিমনাস্থ বিএসএফ ক্যাম্প পর্যন্ত রাস্তা তৈরি করেছিল। মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার অপরাধে অনেক চা শ্রমিক পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। আশা করি, তেলিয়াপাড়া জাদুঘরটিতে (ম্যানেজার বাংলো) যেন বস্তুনিষ্ঠ ও নির্মোহভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরা হবে। মুক্তিযুদ্ধে যার যা অবদান আছে, তার স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।

তেলিয়াপাড়া: বার বার ফিরে যাই
তেলিয়াপাড়া নিয়ে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বিভিন্ন সময় দাপ্তরিক কার্যক্রম ও ব্যক্তিগত ভ্রমণ উপলক্ষে সেখানে অনেকবার যাওয়া হয়েছে। ব্রাক্ষণবাড়িয়ার সরাইলে অবস্থিত তৎকালীন বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি)-এর ১ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক হিসেবে ২০০৮-এর এপ্রিলে যোগদান করি। তেলিয়াপাড়া বিওপি তখন আমাদের ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকার অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে সরাইলে আমার দায়িত্বকাল ছিল খুবই অল্প সময়ের।
তেলিয়াপাড়ায় সর্বশেষ যাওয়া হয় ২০২৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর। ম্যানেজার বাংলোর পাশেই মুক্তিযুদ্ধের স্মারক। এর পেছনেই অসাধারণ দৃশ্যের শাপলা বিল। চা বাগানের মাঝে অদ্ভুত প্রাকৃতিক দৃশ্যময় পরিবেশে ফুটে আছে শত শত লাল শাপলা। পৌষের দুপুরে বিলের ধারে দাঁড়িয়ে মনে হলো আমাদের ১৯৭১-এর শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা যেন লাল শাপলা হয়ে এখানে ফুটে আছে। স্মরণে এলো ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের তরুণ শহীদদের কথাও। ভাবছিলাম, আমাদের ১৯৭১ এর শহীদ ও ২০২৪ এর শহীদদের আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের বাংলাদেশ আমরা কী গড়তে পারব? নাকি সেসব শহীদের স্বপ্নগুলো শাপলা বিলের পরিযায়ী পাখির মতো উড়ে যাবে?

প্রয়োজন তেলিয়াপাড়া বৈঠকের বস্তুনিষ্ঠ ও নির্মোহ মূল্যায়ন
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক ভিত রচনায় তেলিয়াপাড়া সম্মেলন বা কনফারেন্স একটি মাইলফলক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সরকারিভাবে সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই সেনা অফিসাররা সমন্বিতভাবে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি সংগঠন ও সরকার গঠনের তাগিদ অনুভব করেন- তা মুক্তিযুদ্ধের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাদের এই চিন্তা ও পদক্ষেপ মুক্তিযুদ্ধকে সাংগঠনিক ও নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা পালন করে। তেলিয়াপাড়া চা-বাগান মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিসাক্ষী ও টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে ইতিহাসের পাতায় চিরউজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
আশা করি, তেলিয়াপাড়ার ম্যানেজার বাংলোটি অদূর ভবিষ্যতে একটি আকর্ষণীয় জাদুঘরে পরিণত হবে। গড়ে উঠবে আর্কাইভভিত্তিক গবেষণা ও সামরিক ইতিহাস চর্চার কার্যক্রম। তেলিয়াপাড়া জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসা উচিত। তবে এ নিয়ে অতি মূল্যায়ন বা অবমূল্যায়ন যেন না হয়। তেলিয়াপাড়া যেন কখনোই আমাদের দলীয় রাজনীতির বিষয় না হয়। প্রয়োজন বস্তুনিষ্ঠ ও নির্মোহ মূল্যায়ন। আশা করি, জনগণের ব্যাপক ম্যান্ডেট নিয়ে আসা নতুন বিএনপি সরকার তেলিয়াপাড়াসহ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বস্তুনিষ্ঠভাবে রচনায় পথ দেখাবে।

সালাম তেলিয়াপাড়া
বাংলাদেশের স্বাধীনতা এ দেশের জনগণের অকল্পনীয় ত্যাগ ও সংগ্রামের ফসল। এটি মহান আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত। স্বাধীনতা রক্ষা সহজ না। আজ ইউক্রেন ও ইরান তাদের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য বীরদর্পে লড়ছে। তাদের জাতীয় ঐক্য লক্ষণীয়।
তেলিয়াপাড়া দিবসের মতো দিবসগুলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্পিরিট, স্বাধীনতা রক্ষার গুরুত্ব, সংগঠন, জাতীয় ঐক্য ও সমন্বয়ের গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়। এই দিনে তেলিয়াপাড়া সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সব সূর্যসন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সালাম। বাংলাদেশকে ভালোবাসা, সাহস ও ঐক্যের প্রেরণা হয়ে রইবে তেলিয়াপাড়া। সালাম তেলিয়াপাড়া। সালাম বাংলাদেশ। ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গঠনই হোক তেলিয়াপাড়ার বার্তা।


লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, গবেষক ও বিশ্লেষক। সাবেক অধিনায়ক ২ ইস্ট বেঙ্গল