
রমজান মাসে ডায়াবেটিক রোগীরা রোজা রাখতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে প্রায়ই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন। সঠিক শৃঙ্খলা, ইনসুলিন বা ওষুধের মাত্রা সমন্বয় এবং খাদ্যাভ্যাসের সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে অধিকাংশ ডায়াবেটিক রোগীই নিরাপদে রোজা পালন করতে পারেন। এ জন্য প্রয়োজন পূর্বপ্রস্তুতি এবং চিকিৎসকের সঠিক পরামর্শ।
রোজা শুরুর আগের প্রস্তুতি
রমজান শুরু হওয়ার অন্তত এক মাস আগেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত। যারা ওষুধ বা ইনসুলিনের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন, তারা সাধারণত ‘লো-রিস্ক’ বা ‘মডারেট রিস্ক’ গ্রুপে পড়েন। তারা চিকিৎসকের পরামর্শে রোজা রাখতে পারেন। তবে যারা ‘হাই-রিস্ক’ গ্রুপে (যেমন: গর্ভবতী মা, গুরুতর কিডনি রোগী বা হার্ট অ্যাটাকের শিকার রোগী) আছেন, তাদের রোজা রাখার ক্ষেত্রে নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে।
কারা ঝুঁকির মুখে আছেন?
গত তিন মাসের মধ্যে রক্তে গ্লুকোজ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়া (হাইপোগ্লাইসেমিয়া) বা সুগার অনেক বেড়ে যাওয়ার ইতিহাস থাকলে।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বা টাইপ-১ ডায়াবেটিস।
কিডনি জটিলতা (স্টেজ ৪ ও ৫), ডায়ালাইসিস বা হার্ট অ্যাটাকের রোগী।
গুরুতর ইনফেকশন বা ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে।
রমজানে খাদ্যাভ্যাস
শর্করা বাছাই: চিনি বা গুড়ের তৈরি খাবার পরিহার করে জটিল শর্করা (যেমন–লাল চালের ভাত, রুটি, ওটস) সাহ্রিতে খান।
ইফতার: অতিরিক্ত ভাজা-পোড়া ও তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন। মিষ্টি জুসের পরিবর্তে ডাবের পানি, তাজা ফলের রস বা লেবুপানি পান করুন।
সাহ্রি: সাহ্রি না খেয়ে রোজা রাখা একদমই অনুচিত। সাহ্রির নির্ধারিত সময়ের শেষভাগে খাবার গ্রহণ করা ভালো।
পানি পান: ইফতার থেকে সাহ্রি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান করে শরীরকে হাইড্রেটেড রাখুন।
ওষুধ ও ইনসুলিন সমন্বয়
চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধের ডোজ পরিবর্তন করুন। সাধারণত সকালের ওষুধটি ইফতারের শুরুতে এবং রাতের ডোজটি কিছুটা কমিয়ে সাহ্রির আগে সেবন করতে হয়।
রোজায় ইফতারের ১০-১৫ মিনিট আগে ইনসুলিন নিলে রোজা নষ্ট হয় না।
সাহ্রিতে ইনসুলিন বা ওষুধ নেওয়ার পর কোনো অবস্থাতেই না খেয়ে বা কম খেয়ে রোজা রাখা যাবে না।
ব্যায়াম ও শারীরিক পরিশ্রম
রোজা রেখে দিনের বেলায় অতিরিক্ত হাঁটা বা কায়িক পরিশ্রম পরিহার করুন। রাতের তারাবির নামাজ ব্যায়ামের বিকল্প হিসেবে কাজ করে। সন্ধ্যার পর প্রয়োজনে হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে।
রক্ত পরীক্ষা ও জরুরি সতর্কতা
অনেকের ভুল ধারণা থাকে যে রক্ত পরীক্ষায় রোজা ভেঙে যায়, এটি সঠিক নয়।
কখন রোজা ভাঙবেন:
lরক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ৪ মি. মোল/লি.-এর কম অথবা ১৬.৭ মি. মোল/লি.-এর বেশি হলে সঙ্গে সঙ্গে রোজা ভেঙে ফেলা উত্তম।
lযদি বুক ধড়ফড় করা, হাত-পা কাঁপা, প্রচণ্ড ঘাম বা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ
lহাইপোগ্লাইসেমিয়া দেখা দেয়, তবে দ্রুত চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার খেয়ে নিন।
মনে রাখবেন: নিজে নিজে ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করবেন না। একটি গ্লুকোমিটার সংগ্রহে রাখুন এবং রমজানের প্রতিটি দিন নিয়ম মেনে সুস্থ থাকুন।
[কনসালট্যান্ট, ডায়াবেটিস ও এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, ইমপালস হাসপাতাল, ঢাকা]