
একজন সাংবাদিক একদিন আলবার্ট আইনস্টাইনকে প্রশ্ন করেছিলেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার হবে। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “আমি জানি না তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে কী অস্ত্র ব্যবহার হবে, কিন্তু চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ হবে লাঠি-সোটা দিয়ে।” এই সংক্ষিপ্ত উক্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে বড় শঙ্কা— মানুষ নিজেই নিজের ধ্বংসের ক্ষমতা অর্জন করেছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই সীমার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি?
আজকের বিশ্বে এই আশঙ্কা আর কল্পনা নয়, বরং ক্রমেই বাস্তবতার রূপ নিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল, ইরান, লেবানন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে যে সংঘাত বিস্তৃত হচ্ছে, তা এখন আর একক কোনও যুদ্ধ নয়, বরং বহুমাত্রিক এক সংকট। গাজা থেকে লেবানন, সিরিয়া সীমান্ত থেকে পারস্য উপসাগর— পুরো অঞ্চলই অস্থিরতার আগুনে জ্বলছে।
এই উত্তেজনার মধ্যেই সম্প্রতি ইসলামাবাদে একটি গুরুত্বপূর্ণ শান্তি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতায় আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে সীমিত যুদ্ধবিরতি ও সংলাপের একটি কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। তবে পারস্পরিক অবিশ্বাস, কৌশলগত স্বার্থ এবং ক্ষমতার হিসাব-নিকাশের কারণে সেই আলোচনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
এই ব্যর্থতা শুধু একটি বৈঠকের ব্যর্থতা নয়, এটি একটি বিপজ্জনক সংকেত। এর অর্থ হলো— সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এখনও কূটনীতির চেয়ে সামরিক পথকেই বেশি কার্যকর মনে করছে। ফলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। ‘নিয়ন্ত্রিত অস্থিরতা’ যে ভঙ্গুর ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, এই ব্যর্থতা সেটিকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে।
ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে। ১৯১৪ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে—যা দ্রুত বিশ্বব্যাপী সংঘাতে রূপ নেয়। ১৯৩৯ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দীর্ঘদিনের উত্তেজনার বিস্ফোরণ। বর্তমান পরিস্থিতি সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত বহন করছে। তবে এবার ঝুঁকি আরও বড়, কারণ বিশ্বের হাতে রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র—যার ধ্বংসক্ষমতা অতীতের যেকোনও সময়ের তুলনায় বহুগুণ বেশি।
বর্তমান সংঘাতকে তিনটি স্তরে বিশ্লেষণ করা যায়। প্রথমত, সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ- ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা। দ্বিতীয়ত, প্রক্সি যুদ্ধ—লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনে হুথি, সিরিয়ায় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয়তা। তৃতীয়ত, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা—যেখানে আঞ্চলিক শক্তির পাশাপাশি বৈশ্বিক শক্তিগুলোও জড়িয়ে পড়েছে।
বিশ্ব এখন এক ধরনের ‘নিয়ন্ত্রিত অস্থিরতা’র মধ্যে অবস্থান করছে। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বড় শক্তিগুলো সরাসরি যুদ্ধে জড়াচ্ছে না, কিন্তু সংঘাতকে চলমান রেখেছে। এই অবস্থাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা একটি অনিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া মুহূর্তেই পরিস্থিতিকে বিস্ফোরিত করতে পারে।
এদিকে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। চীন উত্থানশীল শক্তি হিসেবে নিজ অবস্থান সুদৃঢ় করছে, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে পশ্চিমাদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্র তার বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাখতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে। এই ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা বর্তমান সংকটকে আরও জটিল ও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
এই উত্তেজনার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়াতেও পড়ছে। বিশেষ করে ভারত একটি সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক সমন্বয় করতে গিয়ে ভারত এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, জ্বালানি বাজার, প্রবাসী শ্রমিক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মাধ্যমে বাংলাদেশসহ পুরো অঞ্চলের ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি পারমাণবিক অস্ত্র। বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ১৩ হাজার পারমাণবিক অস্ত্র মজুত রয়েছে। একটি পূর্ণমাত্রার পারমাণবিক যুদ্ধ মানে শুধু তাৎক্ষণিক ধ্বংস নয়, বরং মানবসভ্যতার অস্তিত্ব সংকট। ‘নিউক্লিয়ার উইন্টার’ পরিস্থিতিতে কৃষি উৎপাদন ভেঙে পড়বে, খাদ্য সংকট দেখা দেবে এবং বিশ্বব্যাপী দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়বে। আইনস্টাইনের ‘লাঠিসোঁটা’ ভবিষ্যদ্বাণী তখন আর কল্পনা থাকবে না—তা হয়ে উঠবে নির্মম বাস্তবতা।
তবে এখনও কিছু বিষয় বিশ্বযুদ্ধকে ঠেকিয়ে রেখেছে। পারমাণবিক প্রতিরোধের বাস্তবতা—যেখানে সবাই জানে যুদ্ধ মানেই পারস্পরিক ধ্বংস। বৈশ্বিক অর্থনীতির পারস্পরিক নির্ভরতা—যেখানে বড় সংঘাত নিজেকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। আর কূটনীতি—যা দুর্বল হলেও এখনও সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েনি।
কিন্তু ইসলামাবাদের ব্যর্থতা দেখিয়ে দিয়েছে—রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে কূটনীতি কার্যকর হয় না। এর ফলে যে আশঙ্কাগুলো সামনে আসছে তা স্পষ্ট: সংঘাতের বিস্তার, প্রক্সি যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি, সরাসরি রাষ্ট্র-রাষ্ট্র সংঘর্ষ এবং পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর মুখোমুখি অবস্থান।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বযুদ্ধ প্রতিরোধ আর কোনও বিলাসিতা নয়, এটি অস্তিত্ব রক্ষার অপরিহার্য শর্ত। যুক্তরাষ্ট্রের সংযম প্রদর্শন, চীনের দায়িত্বশীল ভূমিকা গ্রহণ এবং রাশিয়ার উত্তেজনা না বাড়ানো—এই তিনটি বিষয় এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উচিত সংঘাতের পথ থেকে সরে এসে সংলাপের টেবিলে ফিরে আসা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে জাতিসংঘ। কার্যকর যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা, মানবিক সহায়তা জোরদার করা এবং আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া— এই তিন ক্ষেত্রে সংস্থাটির সক্রিয়তা এখন সময়ের দাবি।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি আমাদের সবার, আমরা কি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবো, নাকি আবারও সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করবো? তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এখনও শুরু হয়নি। কিন্তু তার ছায়া ক্রমেই ঘন হয়ে উঠছে। এই ছায়া দূর করার পথ একটিই—দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, কার্যকর কূটনীতি এবং শান্তির পক্ষে অটল অবস্থান।
আইনস্টাইনের সতর্কবার্তা কেবল একটি উক্তি নয়, এটি ভবিষ্যতের আয়না। সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে চাই— সভ্যতার টিকে থাকা, নাকি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার লড়াই— সিদ্ধান্তটি এখনও আমাদের হাতেই।
লেখক: সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন