
তীব্র শৈত্যপ্রবাহের মধ্যেই শনিবার থেকেই নিউইয়র্ক সিটির ব্রুকলিন ও কুইন্সের বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিভ্রাটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো বাসিন্দা। শনিবার রাতে শুরু হওয়া এই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ফলে সোমবার পর্যন্ত ব্রুকলিনের প্রায় ১ হাজার ৫০০ কন এডিসনের গ্রাহক বিদ্যুৎবিহীন ও হিটিং সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। এছাড়া শনিবার থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত কুইন্সের অনেক এলাকায় শত শত গ্রাহক বিদ্যুৎ বিভ্রাটে দূর্ভোগে পড়েন। ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ব্রুকলিনের বুশউইকে টানা বিদ্যুৎ না থাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে হাজারো গ্রাহকদের।
এছাড়া ফ্ল্যাটবুশ, উইলিয়ামসবার্গ, ফ্লাশিং, জ্যামাইকা ও রিচমন্ড হিল এলাকাও এই বিভ্রাটের আওতায় পড়ে।
তীব্র শীতে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় থাকা গ্রাহকরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান সিটির বাসিন্দা হিসেবে এমন বিপর্যয় কখনো দেখেননি।
রোববার নিউইয়র্কে তাপমাত্রা নেমে আসে মাত্র ৩ ডিগ্রি ফারেনহাইটে, আর প্রবল হিমেল বাতাসে অনুভূত তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ১৪ ডিগ্রি পর্যন্ত।
কন এডিসন জানিয়েছে, তুষার ও রাস্তার লবণ মিশে ভূগর্ভস্থ বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশে ঢুকে পড়ায় এই সমস্যার সৃষ্টি হয়। দ্রুত মেরামতের জন্য একাধিক রাস্তা সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়। সোমবার বিকেলের মধ্যেই অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে বলে জানায় সংস্থাটি।
যেসব বাসিন্দার বাড়িতে বৈদ্যুতিক হিটিং ব্যবস্থা রয়েছে, তারা প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে হয় বাড়িতেই গায়ে একাধিক কাপড় চাপিয়ে থাকতে বাধ্য হন, নয়তো আত্মীয়দের বাড়ি বা শহরের ওয়ার্মিং সেন্টারে আশ্রয় নেন। বুশউইকে বসবাসকারী ৩৫ বছর বয়সী ডিজে ক্যামিলা রোববার বিকেলে তার অ্যাপার্টমেন্টে হিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কাছাকাছি একটি ওয়ার্মিং সেন্টারে চলে যান। পাফার জ্যাকেট গায়ে দিয়ে তিনি বলেন, ঘরের ভেতর এমন ঠান্ডা যে মনে হচ্ছে আলাস্কায় আছি। তার দুইটি পোষা বিড়ালও সঙ্গে রয়েছে এবং তাদের জন্য জরুরি বোর্ডিং খোঁজার চেষ্টা করছেন তিনি। যদি রোববার রাতে অ্যাপার্টমেন্টে ফিরতে হয়, তাহলে সব কাপড় একসঙ্গে পরেই রাত কাটানোর প্রস্তুতি তার।
আরেক বাসিন্দা, দুই সন্তানের বাবা ৬০ বছর বয়সী মাইকেল মারফি জানান, হিট না থাকায় তিনি ও তার পরিবার দুই রাতের জন্য একটি হোটেলে উঠেছেন, যার খরচ পড়ছে ৪৭৭ ডলার। তিনি বলেন, অন্ধকার ও ঠান্ডার মধ্যে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা কমতে থাকা ভয়ংকর অনুভূতি তৈরি করে। চার সন্তানের মা মেলিসা ওয়াশিংটন জানান, তিনি তার পরিবারকে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। তার ভাষায়, ২০০৩ সালের ব্ল্যাকআউটের পর এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি তিনি আর হননি। তিনি অভিযোগ করেন, কন এডিসন বাসিন্দাদের সঙ্গে ঠিকমতো যোগাযোগ করছে না। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় এখন ছোট ফোনের স্ক্রিনেই সুপার বোল দেখতে হচ্ছে।
শহরজুড়ে এই সপ্তাহান্তে প্রায় ৬৫টি ওয়ার্মিং সেন্টার খোলা রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বহু ওয়ার্মিং বাস। প্রবল বাতাসের দাপটে, যেখানে দমকা হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় ৫০ মাইল পর্যন্ত পৌঁছেছে, সেখানে শুধু বাতাসের কারণেই অনুভূত তাপমাত্রা মাইনাস ১৫ থেকে মাইনাস ২৫ ডিগ্রি পর্যন্ত নেমে যাচ্ছে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। অ্যাকুওয়েদারের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ টম কিন্স সতর্ক করে বলেন, যথাযথ সুরক্ষা ছাড়া আধা ঘণ্টার বেশি বাইরে থাকলে ফ্রস্টবাইট ও হাইপোথার্মিয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
রোববার দুপুর ১টা পর্যন্ত পুরো নিউইয়র্ক সিটি জুড়ে বিরল ‘এক্সট্রিম কোল্ড ওয়ার্নিং’ জারি ছিল এবং সোমবার ভোর ৪টা পর্যন্ত সিভিয়ার ওয়েদার অ্যাডভাইজরি বলবৎ রয়েছে। টানা প্রায় দুই সপ্তাহের তীব্র শীতে শহরে অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে হাইপোথার্মিয়ায়, তিনটি মৃত্যুর সঙ্গে মাদক সেবনের যোগসূত্র পাওয়া গেছে এবং আরও দুটি ঘটনা তদন্তাধীন। শনিবার সকালে ব্রুকলিনে একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ছাদে এক ৮১ বছর বয়সী ব্যক্তিকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখছে, প্রচণ্ড ঠান্ডা তার মৃত্যুর কারণ ছিল কি না।