
ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় বা অ্যাসাইলাম অনুমোদন প্রক্রিয়া। অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের আটক ও ডিপোর্টেশন অভিযানের পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের ইমিগ্রেশন কর্মসূচির কার্যক্রম কঠোর করার পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বড় ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে অ্যাসাইলাম প্রক্রিয়া।
নিজ দেশে নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে যারা যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চাইতেন, তাদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই দেশটি একটি শেষ ভরসার জায়গা হিসেবে বিবেচিত ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নীতিগত পরিবর্তন ও প্রশাসনিক কড়াকড়ির ফলে সেই ধারণা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার একাধিক দেশের সঙ্গে ‘নিরাপদ তৃতীয় দেশ’ চুক্তিতে যাচ্ছে। এসব চুক্তির আওতায় আশ্রয়প্রার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে না রেখে অন্য একটি দেশে পাঠিয়ে সেখানে তাদের আশ্রয় আবেদন ও শুনানির অপেক্ষা করতে বলা হচ্ছে। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই নীতির লক্ষ্য হলো সীমান্তে ভিড়, আদালতের দীর্ঘ ব্যাকলগ এবং প্রশাসনিক চাপ কমানো।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ ইতোমধ্যে গুয়াতেমালা ও হন্ডুরাসের মতো মধ্য আমেরিকান দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি করেছে। এছাড়া ইকুয়েডরও তৃতীয় নিরাপদ দেশ হিসেবে চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। বেলিজ, উগান্ডা ও প্যারাগুয়ের মতো আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গেও এমন চুক্তি রয়েছে অথবা প্রক্রিয়াধীন। এই নীতিগত পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘তৃতীয় দেশে অপেক্ষা’ নীতি। এর মূল ধারণা হচ্ছে— কোনো ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় আবেদন করলেও তাকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে না রেখে এমন একটি দেশে পাঠানো হতে পারে, যাকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বলে বিবেচনা করে। সেখানে অবস্থান করেই আশ্রয়প্রার্থীর মামলার শুনানি চলবে কিংবা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রশাসনের যুক্তি অনুযায়ী, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত ও বিচার ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ কমানোর একটি কার্যকর উপায়।
তবে বাস্তব প্রেক্ষাপটে এই নীতির প্রয়োগ বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। প্রথমত, ‘নিরাপদ তৃতীয় দেশ’ ধারণাটি সর্বজনগ্রাহ্য নয়। যেসব দেশে আশ্রয়প্রার্থীদের পাঠানো হচ্ছে, সেসব দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আশ্রয় অবকাঠামো, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আইনি সহায়তা ব্যবস্থার সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে আশ্রয়প্রার্থীরা নতুন করে অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, এই নীতির ফলে আশ্রয়প্রার্থীদের আইনি প্রক্রিয়া আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলে যেভাবে সহজে আইনজীবীর সহায়তা পাওয়া, মামলার নথি প্রস্তুত করা কিংবা আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা সম্ভব, তৃতীয় দেশে পাঠানো হলে তা অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবসম্মত থাকে না। এর ফলে অনেক আবেদনকারী কার্যত পূর্ণাঙ্গ ও ন্যায্য শুনানির সুযোগ হারাতে পারেন— যা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়। আশ্রয় সংক্রান্ত মামলাগুলো এমনিতেই দীর্ঘসূত্রতার শিকার। তৃতীয় দেশে পাঠানোর ফলে এই অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হয় এবং তা আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য মানসিকভাবে অত্যন্ত ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থানের অভাব এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ— সব মিলিয়ে আশ্রয়প্রার্থীদের মানসিক চাপ বহুগুণে বেড়ে যাচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই নীতি আশ্রয় ব্যবস্থার মৌলিক চেতনাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের মূল লক্ষ্য হলো— যিনি আশ্রয় চাইছেন, তাকে নিরাপদ পরিবেশে থেকে নিজের দাবি উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া। কিন্তু তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে সেই প্রক্রিয়া চালানো হলে আশ্রয়ের মানবিক দিকটি প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার নিচে চাপা পড়ছে বলে তারা মনে করছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের অবস্থান হলো, এটি কোনো আশ্রয় নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং একটি ব্যবস্থাপনা কৌশল। তাদের দাবি, বিপুল সংখ্যক আবেদন, সীমান্তে ক্রমবর্ধমান চাপ এবং আদালতের দীর্ঘ ব্যাকলগ— এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, আইনগত কাঠামোর মধ্যেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য বিকল্প পথ খোলা রাখা হচ্ছে। সকল বিবেচনায় বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের আশ্রয় ব্যবস্থায় ‘তৃতীয় দেশ নীতি’ একটি গভীর নীতিগত পরিবর্তনের প্রতীক।
এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং আশ্রয়, নিরাপত্তা ও মানবাধিকার এই তিনটি মৌলিক ধারণার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নে একটি চলমান বিতর্ক। ভবিষ্যতে আদালতের রায়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক চাপ— সবকিছু মিলিয়ে এই নীতির চূড়ান্ত গতিপথ নির্ধারিত হবে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক কঠিন ও অনিশ্চিত সময়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের পথ আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে।