‘ভারত আমাদের বন্দির মতো নৌকায় তুলল – তারপর সমুদ্রে ফেলে দিল’

বিবিসির অনুসন্ধান
ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৯ আগস্ট ২০২৫, ২১:২৫

মিয়ানমার বর্তমানে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে জাতিগত মিলিশিয়া ও প্রতিরোধযোদ্ধাদের সঙ্গে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে নিমগ্ন। ফলে নূরুলের পরিবারের সঙ্গে তার পুনর্মিলনের সম্ভাবনা কার্যত শূন্য।
বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দিল্লি থেকে তাদের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, তারপর ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজে তুলে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয় লাইফ জ্যাকেটসহ। পরে তারা সাঁতরে তীরে ওঠে এবং এখন মিয়ানমারের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রতিরোধগোষ্ঠী বা ‘বা হ্তু আর্মি’র (বিএইচএ) আশ্রয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।
একজন শরণার্থী ফোনে তার ভাইকে জানান, ‘আমাদের হাত বেঁধে, চোখ ঢেকে বন্দির মতো নৌকায় তোলা হয়েছিল। তারপর সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হলো।’
জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ার টমাস অ্যান্ড্রুজ বলেছেন, এই অভিযোগ প্রমাণের মতো যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
ভারত সরকার রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, বরং ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে গণ্য করে। অথচ ২৩ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা ভারতের মাটিতে জাতিসংঘে নিবন্ধিত শরণার্থী হিসেবে বসবাস করছেন।
শরণার্থীদের অভিযোগ, ৬ মে দিল্লির বিভিন্ন এলাকা থেকে বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহের নামে তাদের থানায় ডেকে নেওয়া হয়। এরপর আটক করে ইন্দারলোক ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়। সেখান থেকে প্লেনে করে আন্দামানে নেওয়া হয়, তারপর নৌবাহিনীর জাহাজে তুলে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়।
রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ জানায়, যাত্রাপথে মারধর ও হেনস্তা করা হয়েছে। এমনকি তাদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে কটূক্তি করা হয়েছে, কে মুসলিম, কে খ্রিস্টান তা যাচাই করতে পোশাক খুলতেও বাধ্য করা হয়।
৯ মে স্থানীয় জেলেরা তাদের খুঁজে পায় এবং ফোন ব্যবহার করতে দেয়। তখনই তারা পরিবারকে খবর দিতে পারে। বর্তমানে ‘বা হ্তু আর্মি’ তাদের খাবার ও আশ্রয় দিচ্ছে। তবে মিয়ানমারে প্রাণহানির আশঙ্কায় পরিবারগুলো ভীষণ উদ্বিগ্ন।
এ বিষয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছে। তবে শুনানির সময় একজন বিচারক অভিযোগগুলোকে ‘কল্পনাপ্রসূত’ বলে মন্তব্য করেন। আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর আদালত ঠিক করবে, রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে কিনা নাকি অবৈধ অভিবাসী হিসেবে দেশে থেকে বের করে দেওয়া হবে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ৪০ জনকে সমুদ্রে ফেলে দেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে ভারতে মুসলিমবিরোধী বিদ্বেষই মূল প্রেরণা। এতে দেশটির রোহিঙ্গা সম্প্রদায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
নূরুল আমিনের মতো অনেকেই এখন বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপনে আছেন। তাঁর আশঙ্কা, ‘ভারত সরকার আমাদেরও যে কোনো সময় ধরে নিয়ে গিয়ে সমুদ্রে ফেলে দেবে।’
জাতিসংঘের প্রতিনিধি অ্যান্ড্রুজ বলেন, ‘রোহিঙ্গারা ভারতে স্বেচ্ছায় নেই। তারা এসেছে কারণ মিয়ানমারে ভয়াবহ সহিংসতার মধ্যে থেকে তারা জীবন বাঁচাতে পালিয়েছে।’

 

তথ্যসূত্র:বিবিসি