এআই আসক্তি হতে পারে বড় মানসিক স্বাস্থ্য-চ্যালেঞ্জ

ডেস্ক রিপোর্ট
  ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৮

লেখালেখি, পড়াশোনা, কাজের পরিকল্পনা কিংবা মনের কথা ভাগ করে নেওয়া—জীবনের নানা প্রয়োজনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। মুহূর্তেই উত্তর পাওয়া, নতুন ধারণা খুঁজে নেওয়া কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যার পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ প্রযুক্তিটিকে অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তুলেছে। কিন্তু এই নির্ভরতা যখন নিজের চিন্তা, সিদ্ধান্ত ও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের জায়গা দখল করতে শুরু করে, তখনই দেখা দেয় উদ্বেগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইয়ের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সহজ সমাধানের অভ্যাস
কোনো বিষয়ে আটকে গেলে এআইয়ের সাহায্য নেওয়া এখন বেশ সহজ। একটি প্রশ্ন লিখলেই পাওয়া যায় উত্তর, লেখার খসড়া, নতুন ধারণা কিংবা সমস্যা সমাধানের সম্ভাব্য উপায়। এতে সময় ও শ্রম বাঁচে। তবে প্রতিটি সমস্যার সমাধান খুঁজতে এআইয়ের ওপর নির্ভর করার অভ্যাস তৈরি হলে নিজের চিন্তাভাবনা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা চর্চার সুযোগ কমে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই ব্যবহার করলেই কেউ আসক্ত হয়ে পড়েন না। বরং উদ্বেগের বিষয় হলো, কেউ যখন এআই ছাড়া কাজ করতে, সিদ্ধান্ত নিতে কিংবা নিজের অনুভূতি সামলাতে অসুবিধা বোধ করেন। অর্থাৎ প্রযুক্তির ব্যবহার যখন প্রয়োজনের গণ্ডি ছাড়িয়ে দৈনন্দিন জীবনের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
মানসিক স্বস্তি থেকে নির্ভরতা
একাকিত্ব, দুশ্চিন্তা কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যার সময় অনেকে এআই চ্যাটবটের সঙ্গে কথা বলে স্বস্তি পান। চ্যাটবট যেকোনো সময় উত্তর দিতে পারে, কথা শুনতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিচার না করেই সহানুভূতিশীল ভঙ্গিতে প্রতিক্রিয়া জানায়। ফলে মানুষের সঙ্গে কথা বলার তুলনায় এআইয়ের কাছে নিজের কথা প্রকাশ করাকে কারও কারও কাছে সহজ মনে হতে পারে। তবে এই স্বস্তি দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতায় পরিণত হলে সমস্যা তৈরি হতে পারে। মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মতের অমিল, অপেক্ষা, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা প্রত্যাখ্যানের মতো পরিস্থিতি সামলাতে হয়। এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই যোগাযোগের দক্ষতা ও মানসিক দৃঢ়তা গড়ে ওঠে। বাস্তব সম্পর্কের বদলে কেউ যদি ক্রমাগত চ্যাটবটের সঙ্গ বেছে নিতে থাকেন, তাহলে সামাজিক যোগাযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সৃজনশীলতা ও চিন্তাশক্তিতে প্রভাব
এআই লেখালেখি, তথ্য সাজানো, নতুন ধারণা তৈরি এবং জটিল বিষয় সহজভাবে বুঝতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু প্রতিটি কাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এআইয়ের ওপর নির্ভর করলে নিজে চিন্তা করা, যুক্তি বিশ্লেষণ করা ও সৃজনশীলভাবে সমস্যা সমাধানের অভ্যাস দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। লেখার ক্ষেত্রে এআই সুন্দর বাক্য তৈরি করে দিতে পারে। কিন্তু নিজের ভাবনা খুঁজে বের করা, তথ্যের সত্যতা যাচাই করা এবং নিজস্ব লেখার ধরন গড়ে তোলার জন্য ব্যক্তিগত চর্চা প্রয়োজন। এআইয়ের তৈরি উত্তর যাচাই না করে গ্রহণ করলে কাজের ফল ভালো দেখালেও শেখার প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে।
তবে এআই ব্যবহার করলেই মানুষের বুদ্ধিমত্তা বা সৃজনশীলতা কমে যায়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত দীর্ঘমেয়াদি প্রমাণ এখনো নেই। মূল বিষয় হলো, প্রযুক্তিটি নিজের দক্ষতা বাড়াতে ব্যবহার করা হচ্ছে, নাকি নিজের চিন্তাভাবনার বিকল্প হিসেবে নেওয়া হচ্ছে।
যেসব লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়
এআই ব্যবহারের সময় কতটা কাটছে, শুধু তা দিয়ে নির্ভরতার মাত্রা বোঝা যায় না। বরং এর কারণে দৈনন্দিন জীবনে কী পরিবর্তন আসছে, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। কাজ, পড়াশোনা বা ঘুমের ক্ষতি করে দীর্ঘ সময় চ্যাটবটের সঙ্গে কাটানো, বন্ধু ও পরিবারের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া কিংবা আগে ভালো লাগত এমন কাজের প্রতি আগ্রহ হারানো সতর্কতার লক্ষণ হতে পারে। এ ছাড়া সাধারণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেও বারবার এআইয়ের অনুমোদন খোঁজা, চ্যাটবট ব্যবহার করতে না পারলে অস্থির বোধ করা এবং এর পরামর্শ ছাড়া নিজের সিদ্ধান্তে আস্থা না পাওয়াও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। কেউ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকলে চ্যাটবটের কাছ থেকে পাওয়া উত্তর তাঁর ভুল ধারণা বা অস্বাস্থ্যকর চিন্তাকে আরও জোরালো করে তুলতে পারে। এআইয়ের উত্তর সাবলীল ও আশ্বস্তকারী হলেও তা সব সময় সঠিক বা ব্যক্তির পরিস্থিতির জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে।
মানসিক সমস্যায় এআই কি বিকল্প?
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য জানা, নিজের অনুভূতি গুছিয়ে নেওয়া কিংবা পেশাদার সহায়তা কোথায় পাওয়া যেতে পারে, তা খুঁজতে এআই সহায়ক হতে পারে। কিন্তু মানসিক সমস্যার সঠিক মূল্যায়ন, ঝুঁকি নিরূপণ ও চিকিৎসার জন্য প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের সহায়তা প্রয়োজন। এআইয়ের উত্তরকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ না করে তথ্য যাচাই করা এবং গুরুতর বা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক সমস্যায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কিংবা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া জরুরি। একইভাবে, ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতা বা গুরুত্বপূর্ণ জীবনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শুধু চ্যাটবটের পরামর্শের ওপর নির্ভর না করে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করা উচিত।

প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিক সম্পর্ক
এআইকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা নয়, বরং সচেতনভাবে ব্যবহার করাই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো লেখা তৈরিতে সাহায্য নিলে নিজের ভাষায় তা পরিমার্জন করা, কোনো তথ্য পেলে তার সত্যতা যাচাই করা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজে চিন্তা করার অভ্যাস বজায় রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, সরাসরি কথা বলা, পছন্দের কাজে যুক্ত থাকা এবং পর্যাপ্ত ঘুমের মতো অভ্যাস মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক। এআই ব্যবহারের কারণে যদি বাস্তব জীবনের দায়িত্ব, সম্পর্ক বা মানসিক স্বস্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে ব্যবহারের ধরন ও সময় পুনর্বিবেচনা করা দরকার।
প্রযুক্তি মানুষের কাজ সহজ করতে পারে, নতুন সম্ভাবনার দরজাও খুলে দিতে পারে। কিন্তু নিজের চিন্তা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের জায়গাটি পুরোপুরি প্রযুক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। এআইয়ের সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি স্বাধীন চিন্তা ও মানবিক সংযোগ বজায় রাখাই হতে পারে মানসিক সুস্থতা রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
সূত্র: এনডিটিভি