
আমেরিকা—অনেকের কাছে এটি শুধু একটি দেশ নয়, বরং একটি স্বপ্ন। উন্নত জীবন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এবং সামাজিক মর্যাদার আশায় প্রতিবছর হাজার হাজার বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ সব সময় মসৃণ নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এই যাত্রা গিয়ে ঠেকে অবৈধ অভিবাসনের কঠিন, অনিশ্চিত এবং ভয়াবহ বাস্তবতায়।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের আগস্ট ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে আনুমানিক ১ কোটি ৪০ লাখ অবৈধ (অননুমোদিত) অভিবাসী বসবাস করছিলেন—যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এই সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.১ শতাংশ, এবং মোট বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। প্রাথমিক তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে ২০২৪ সালেও এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
যদিও সরকারি পরিসংখ্যানে নির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশিদের সংখ্যা আলাদা করে উল্লেখ করা হয় না, বিভিন্ন গবেষণা ও কমিউনিটি-ভিত্তিক অনুমান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশি অনিয়মিত বা অবৈধ অবস্থায় বসবাস করছেন। এর মধ্যে শুধু নিউইয়র্ক মহানগরীতেই ৫০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি অনিয়মিত অভিবাসী থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হয়।
এই সংখ্যাগুলো শতভাগ নিশ্চিত নয়, কারণ অবৈধ অভিবাসীরা সাধারণ জরিপে নিজেদের আইনি অবস্থান প্রকাশ করেন না। ফলে গবেষকদের মাঠপর্যায়ের তথ্য, কমিউনিটি সংগঠন এবং পরোক্ষ পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর করেই এই হিসাব করা হয়।
বাংলাদেশি অভিবাসীদের একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন ভিজিট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা অথবা আশ্রয়প্রার্থী (Asylum Seeker) হিসেবে। কিন্তু দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া, কাজের অনুমতি না পাওয়া, বা ভুল আইনি পরামর্শের কারণে অনেকেই বৈধ স্ট্যাটাস ধরে রাখতে ব্যর্থ হন।
এক্ষেত্রে দালাল চক্র ও ভুয়া পরামর্শদাতাদের ভূমিকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। "সব ঠিক হয়ে যাবে", "কাগজ পাওয়া নিশ্চিত"—এমন আশ্বাসে অনেকেই শেষ পর্যন্ত পড়ে যান অনিয়মিত অবস্থার ফাঁদে।
অবৈধ অভিবাসীদের প্রতিদিনের জীবন কাটে এক অদৃশ্য ভয়ের মধ্যে। কখন ইমিগ্রেশন অফিসের চিঠি আসবে, কখন কর্মস্থলে অভিযান (রেইড) হবে—এই আতঙ্ক সব সময় সঙ্গী হয়ে থাকে।
চিকিৎসা সেবা নেওয়া, ভালো চাকরি পাওয়া, ড্রাইভিং লাইসেন্স করা কিংবা আইনি সহায়তা চাওয়া—সব ক্ষেত্রেই রয়েছে সীমাবদ্ধতা। অনেক বাংলাদেশি কম মজুরিতে দিনে ১০–১২ ঘণ্টা কাজ করতে বাধ্য হন। শ্রমের ন্যায্য মূল্য পান না, তবুও মুখ খুলতে পারেন না—কারণ অভিযোগ করলেই পরিচয় ফাঁস হওয়ার ভয়।
সবচেয়ে গভীর ক্ষতটি মানসিক। দেশে থাকা মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে বছরের পর বছর দেখা হয় না। কেউ কেউ নিজের সন্তানের জন্ম কিংবা বাবা-মায়ের জানাজায়ও অংশ নিতে পারেননি। দেশে ফিরে গেলে আবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ হারানোর ভয় অনেককেই দেশে যাওয়া থেকে বিরত রাখে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে রিপাবলিকান প্রশাসন ও তার নতুন ইমিগ্রেশন এজেন্ডায় অবৈধ অভিবাসীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে। ট্রাম্পের ঘোষিত ও প্রস্তাবিত নীতিগুলোর মধ্যে রয়েছে—অবৈধ অভিবাসীদের দ্রুত ডিপোর্টেশন (Mass Deportation), আশ্রয় আইনে আরও কঠোরতা ও সীমাবদ্ধতা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার ও ICE অভিযানের বিস্তৃতি, সরকারি সুবিধা ও কাজের সুযোগে আরও কড়াকড়ি, দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও আইনি সুযোগ সীমিত করা। এই নীতিগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশিসহ সব অবৈধ অভিবাসীদের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সব প্রতিকূলতার মাঝেও আশার আলো পুরোপুরি নিভে যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থায় এখনও কিছু আইনি পথ খোলা আছে—যেমন আশ্রয় মামলা, পারিবারিক পিটিশন, কর্মসংস্থানের মাধ্যমে (EB3) স্ট্যাটাস পরিবর্তন, বা বিশেষ পরিস্থিতিতে আইনি সুরক্ষা। তবে এসব ক্ষেত্রে যোগ্য ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত ইমিগ্রেশন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসীদের গল্প শুধুই আইন ভাঙার গল্প নয়। এটি বেঁচে থাকার লড়াই, পরিবারের জন্য আত্মত্যাগ, স্বপ্ন পূরণের মরিয়া চেষ্টা এবং এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কাহিনি।
এই গল্পগুলো জানা জরুরি, বলা জরুরি—যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আবেগ নয়, তথ্য ও সচেতনতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সচেতনতা ছড়ালেই কেবল এই নীরব সংগ্রামের ভাষা পাওয়া সম্ভব।